ঢাকা, রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬, ৪ শ্রাবণ ১৪৩৩

মস্তিষ্কের ক্ষতি করছে যেসব দৈনন্দিন অভ্যাস: সুস্থ মস্তিষ্কের জন্য জরুরি করণীয়

২০২৫ নভেম্বর ০৪ ১৭:৫৩:৩৪

মস্তিষ্কের ক্ষতি করছে যেসব দৈনন্দিন অভ্যাস: সুস্থ মস্তিষ্কের জন্য জরুরি করণীয়

বর্তমান জীবনযাত্রায় বেশ কিছু সাধারণ অভ্যাস আমাদের মস্তিষ্কের অজান্তেই গুরুতর ক্ষতি করছে, যা স্মৃতিশক্তি হ্রাস, মনোযোগের অভাব, মেজাজের পরিবর্তন এবং এমনকি ডিমেনশিয়া বা আলঝেইমারের মতো রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। সম্প্রতি বিবিসি বাংলা'র এক প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুল, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ নিউরোলজিক্যাল ডিসঅর্ডার অ্যান্ড স্ট্রোক (এনআইএনডিএস) এবং অন্যান্য গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্যের ভিত্তিতে এমনই আশঙ্কার কথা তুলে ধরা হয়েছে।

প্রতিবেদনে মস্তিষ্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে এমন কিছু অভ্যাস ও তার প্রতিকার সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে:

১. অপর্যাপ্ত ঘুম: প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ২৪ ঘণ্টায় ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা ঘুম অপরিহার্য। ঘুমের অভাবে নতুন কোষ গঠিত হয় না, মস্তিষ্কের বিষাক্ত পদার্থ পরিষ্কার হয় না। এতে স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয়, মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটে, মেজাজ খিটখিটে হয় এবং সিদ্ধান্তহীনতা দেখা দেয়। দীর্ঘদিনের অপর্যাপ্ত ঘুম ডিমেনশিয়া ও আলঝেইমারের ঝুঁকি বাড়ায়।

করণীয়: প্রতিদিন অন্তত ৭-৮ ঘণ্টা ঘুমানো। ঘুমানোর এক ঘণ্টা আগে ডিভাইস ব্যবহার বন্ধ করা, শোবার ঘর পরিষ্কার রাখা, আলো কমিয়ে আরামদায়ক পরিবেশ তৈরি করা।

২. মাথা ঢেকে ঘুমানো: মাথা ঢেকে ঘুমালে মস্তিষ্কে অক্সিজেনের অভাব দেখা দেয়, কারণ নিঃশ্বাসের সাথে নির্গত কার্বন ডাই অক্সাইড আশেপাশে জমা হতে থাকে।

৩. সকালের নাস্তা এড়িয়ে যাওয়া: সারারাত না খেয়ে থাকার পর সকালে নাস্তা না করলে রক্তে শর্করার মাত্রা কমে যায়, যা মস্তিষ্কের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়। দিনের পর দিন এমনটা হলে মস্তিষ্কের ক্ষয় হয় এবং কোষগুলো কার্যকারিতা হারায়।

করণীয়: নিয়মিত সকালে স্বাস্থ্যকর নাস্তা গ্রহণ করা।

৪. পর্যাপ্ত পানি পান না করা: মস্তিষ্কের ৭৫ শতাংশই পানি। পানিশূন্যতা মস্তিষ্কের টিস্যু সঙ্কুচিত করে এবং কোষের কার্যক্ষমতা হ্রাস করে। এতে যৌক্তিক চিন্তাভাবনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা কমে যায়।

করণীয়: একজন প্রাপ্তবয়স্কের প্রতিদিন কমপক্ষে ২ লিটার পানি পান করা উচিত, যা ওজন, স্বাস্থ্য, বয়স ও আবহাওয়ার ওপর ভিত্তি করে বাড়তে পারে।

৫. অতিরিক্ত চাপ ও অলস জীবনযাপন: দীর্ঘ সময় মানসিক চাপে থাকলে মস্তিষ্কের কোষ মারা যায় এবং ফ্রন্টাল কর্টেক্স (মস্তিষ্কের সামনের অংশ) সঙ্কুচিত হয়, যা স্মৃতিশক্তি ও চিন্তাভাবনার ক্ষতি করে। একইভাবে দীর্ঘক্ষণ শুয়ে বসে থাকা স্থূলতা, হৃদরোগ ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়, যা পরোক্ষভাবে ডিমেনশিয়ার কারণ হতে পারে।

করণীয়: অতিরিক্ত চাপ এড়িয়ে চলা। অসুস্থ থাকলে মস্তিষ্ককে বিশ্রাম দেওয়া। সপ্তাহে অন্তত তিন দিন ৩০ মিনিট করে হাঁটা এবং প্রতি আধা ঘণ্টা পর পর চেয়ার ছেড়ে হেঁটে আসা।

৬. গুগল সার্চের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা: প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা মস্তিষ্কের নিজস্ব স্মৃতি ও চিন্তাশক্তিকে দুর্বল করে দেয়।

করণীয়: সবকিছু গুগল সার্চ না করে মনে রাখার চেষ্টা করা এবং সুডোকু বা শব্দজটের মতো মস্তিষ্কের ব্যায়াম করা।

৭. হেডফোন ব্যবহার ও উচ্চ শব্দে গান শোনা: ৩০ মিনিটের বেশি সময় ধরে উচ্চ ভলিউমে হেডফোন বা ইয়ারপড ব্যবহার করলে শ্রবণশক্তির স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে, যা সরাসরি মস্তিষ্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

করণীয়: ভলিউম ৬০ শতাংশের নিচে রেখে গান শোনা এবং এক ঘণ্টা বিরতি দিয়ে হেডফোন ব্যবহার করা।

৮. মাথা ঝাঁকানো বা হেডব্যাং করা: ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নাল অনুযায়ী, এটি মস্তিষ্কের কোষ মেরে ফেলে মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে।

৯. একা একা থাকা ও অসামাজিকতা: একাকীত্ব পর্যাপ্ত ঘুমের অভাবের মতোই মস্তিষ্কের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। এতে বিষণ্নতা, উদ্বেগ, ডিমেনশিয়া ও আলঝেইমারের ঝুঁকি বাড়ে।

করণীয়: নিয়মিত বন্ধু ও পরিবারের সাথে সময় কাটানো, বিশেষ করে ইতিবাচক মানসিকতার মানুষের সাথে মিশলে মস্তিষ্ক উদ্দীপিত থাকে।

১০. নেতিবাচক চিন্তা ও সঙ্গ: ক্রমাগত নেতিবাচক চিন্তাভাবনা মানসিক চাপ, হতাশা ও উদ্বেগ বাড়ায়। এর ফলে মস্তিষ্কে অ্যামাইলয়েড ও টাউ নামক প্রোটিন জমা হয়, যা ডিমেনশিয়া ও আলঝেইমারের প্রধান কারণ।

করণীয়: নেতিবাচক চিন্তাগুলোকে তাৎক্ষণিকভাবে থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা। প্রয়োজনে মনোবিদের সাহায্য নেওয়া এবং নেতিবাচক মানুষের সঙ্গ এড়িয়ে চলা। অতিরিক্ত নেতিবাচক খবর দেখা থেকেও বিরত থাকা।

১১. অন্ধকারে সময় কাটানো: অন্ধকারে দীর্ঘ সময় কাটালে মস্তিষ্কে চাপ সৃষ্টি হয়, যা বিষণ্নতার কারণ হতে পারে। সূর্যের আলো মস্তিষ্কের জন্য অত্যন্ত জরুরি।

করণীয়: প্রতিদিন সূর্যের আলোতে যাওয়া। ঘরে থাকলে দরজা-জানালা খুলে দেওয়া যাতে পর্যাপ্ত আলো বাতাস প্রবেশ করে।

১২. অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস: জাঙ্ক ফুড, ভাজাপোড়া, অতিরিক্ত চিনিযুক্ত খাবার এবং কোমল পানীয় মস্তিষ্কের ধমনীতে কোলেস্টেরল জমিয়ে রক্তপ্রবাহ কমিয়ে দেয়। এতে স্মৃতিশক্তি ও চিন্তাশক্তি লোপ পায়, যা ডিমেনশিয়া ও আলঝেইমারের ঝুঁকি বাড়ায়।

করণীয়: পরিমিত ও সঠিক খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করা। ডায়েট বলতে শুধু চর্বি বাদ দেওয়া নয়, বরং স্বাস্থ্যকর চর্বিসহ সকল ধরনের খাবার পরিমিত পরিমাণে গ্রহণ করা। একজন পুষ্টিবিদের পরামর্শে নিজের ডায়েট তৈরি করে তা মেনে চলা উচিত।

১৩. মদপান ও ধূমপান: মদপান ও ধূমপান মস্তিষ্কের স্নায়ু সঙ্কুচিত করে, কোষ ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং মস্তিষ্কের হিপোক্যাম্পাসকে (যেখানে স্মৃতি জমা হয়) ক্ষতিগ্রস্ত করে, যার ফলে আলঝেইমার ও ডিমেনশিয়া হতে পারে।

এই অভ্যাসগুলো পরিহার করে স্বাস্থ্যকর জীবনধারা অনুসরণ করা গেলে মস্তিষ্ককে দীর্ঘকাল সচল ও সুস্থ রাখা সম্ভব। বিবিসি বাংলা এমন আরও বিষয়বস্তু পেতে তাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করতে এবং ওয়েবসাইটে চোখ রাখতে অনুরোধ করেছে।

পাঠকের মতামত:

সর্বোচ্চ পঠিত