ঢাকা, মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬, ৬ শ্রাবণ ১৪৩৩

গ্যাস সংকটের অশনিসংকেত: দেশ কি বড় জ্বালানি বিপর্যয়ের মুখে

২০২৬ জানুয়ারি ১১ ২২:৪২:৫৪

গ্যাস সংকটের অশনিসংকেত: দেশ কি বড় জ্বালানি বিপর্যয়ের মুখে

বাংলাদেশের গ্যাস খাতে ধীরে ধীরে এক গভীর সংকটের ছায়া নেমে আসছে। বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে উৎপাদন কমছে, নতুন কূপ খনন ও অনুসন্ধানের গতি আশানুরূপ নয়, আর এলএনজি আমদানির পরিকল্পনাও নানা জটিলতায় থমকে আছে। এই বাস্তবতায় জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম মনে করছেন, এখনই কার্যকর সিদ্ধান্ত না নিলে দেশের শিল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং সামগ্রিক অর্থনীতি বড় ধরনের গ্যাস সংকটে পড়তে পারে।

কেন বাড়ছে গ্যাস সংকট?

দেশের প্রধান গ্যাসক্ষেত্রগুলোতে মজুদ থাকলেও সেগুলো থেকে টেকসই উৎপাদন বাড়ানো যাচ্ছে না। অনেক পুরোনো কূপে উৎপাদন দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে, আর নতুন কূপ খননের মাধ্যমে যে পরিমাণ গ্যাস যোগ হচ্ছে, তা দিয়ে এই ঘাটতি পূরণ হচ্ছে না। বিশেষ করে বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্র থেকে দেশের মোট উৎপাদনের বড় অংশ আসে, কিন্তু সেখানেও চাপ কমছে। যেকোনো সময় কয়েকশ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস কমে গেলে সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধাক্কা লাগতে পারে।

মূল সমস্যা কোথায়?

বিশেষজ্ঞদের মতে, তিনটি বড় ঘাটতির কারণে সংকট ঘনীভূত হচ্ছে—

বিনিয়োগের অভাব – দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ যথেষ্ট না হওয়ায় বড় পরিসরে অনুসন্ধান ও উন্নয়ন থমকে আছে।

আধুনিক প্রযুক্তির ঘাটতি – উন্নত রিজার্ভ ম্যানেজমেন্ট ও উন্নয়ন প্রযুক্তি প্রয়োগ না করায় অনেক সম্ভাবনাময় স্তর কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

দক্ষ জনবলের সীমাবদ্ধতা – জটিল অপারেশন পরিচালনায় প্রয়োজনীয় আন্তর্জাতিক মানের অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণের অভাব রয়েছে।

কী করা প্রয়োজন?

গ্যাস সংকট মোকাবিলায় কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপের কথা বলা হচ্ছে—

আন্তর্জাতিক রিজার্ভ ম্যানেজমেন্ট ও কনসাল্টিং ফার্ম নিয়োগ করে বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্রগুলোর পূর্ণাঙ্গ পুনর্মূল্যায়ন।

ছোট ও মাঝারি আকারের গ্যাসস্তর দ্রুত উৎপাদনে আনা।

ছাতকের মতো সম্ভাবনাময় ক্ষেত্রগুলোতে আধুনিক প্রযুক্তি দিয়ে অনুসন্ধান জোরদার করা।

অনশোর ও অফশোর উভয় এলাকায় লাইসেন্সিং ও অনুসন্ধান প্রক্রিয়া সহজ ও স্বচ্ছ করা।

আন্তর্জাতিক কোম্পানির (যেমন শেভরন) উৎপাদন বৃদ্ধির প্রস্তাবগুলো রাজনৈতিক নয়, বরং প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করা।

এলএনজি ও বিকল্প জ্বালানির ভূমিকা

দেশীয় উৎপাদন কমে যাওয়ায় এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। কিন্তু নতুন ভাসমান টার্মিনাল স্থাপনের প্রকল্প বিলম্বিত হওয়ায় সেই বিকল্পও পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। স্বল্পমেয়াদে সিএনজি ও গৃহস্থালি খাতে গ্যাসের দাম বাস্তবসম্মতভাবে সমন্বয় করে ব্যবহার কমানো এবং এলপিজির দিকে ঝোঁক বাড়ানো যেতে পারে।

বিদ্যুৎ খাতে কয়লাভিত্তিক ও পারমাণবিক কেন্দ্র থেকে উৎপাদন বাড়িয়ে গ্যাসের ওপর চাপ কমানোর কথাও বলা হচ্ছে। একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার দ্রুত বাড়ানো জরুরি—বিশেষ করে সৌরবিদ্যুৎ ও রুফটপ সোলার প্রকল্পের মাধ্যমে।

দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা

শুধু গ্যাস বা কয়লার ওপর নির্ভর করে ভবিষ্যতের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে বড় আকারে বিনিয়োগ, শিল্প ও কৃষিতে সোলার ব্যবহারের বিস্তার এবং একটি বাস্তবসম্মত দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি রোডম্যাপই পারে দেশকে আসন্ন গ্যাস বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে।

পাঠকের মতামত:

সর্বোচ্চ পঠিত