ঢাকা, বুধবার, ৩ জুন ২০২৬, ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

বাংলাদেশের যে এলাকায় সবচেয়ে বড় ভূমিকম্প হতে পারে

২০২৫ নভেম্বর ২৪ ১৮:৩৩:০৭

বাংলাদেশের যে এলাকায় সবচেয়ে বড় ভূমিকম্প হতে পারে

নরসিংদীর মাধবদী এলাকায় শুক্রবার যে শক্তিশালী ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে, তা পুরো দেশকে আতঙ্কে ফেলে দিয়েছে। রিখটার স্কেলে ৫.৭ মাত্রার এই কম্পন রাজধানীসহ বিভিন্ন অঞ্চলে তীব্রভাবে অনুভূত হয় এবং এতে এখন পর্যন্ত কমপক্ষে ১০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে, আহত হয়েছেন পাঁচ শতাধিক মানুষ।

বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, ঢাকা থেকে মাত্র ৩০ কিলোমিটার দূরের ভূগর্ভে বহুদিন ধরে জমে থাকা শক্তির একটি অংশ বেরিয়ে আসার ফলেই এই ভূমিকম্প হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (USGS) জানিয়েছে, প্রায় সাত কোটি মানুষ বিভিন্ন মাত্রার ঝাঁকুনি অনুভব করেছেন। আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, এটি সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ভূমিকম্পগুলোর একটি।

শনিবার একই এলাকায় আরও দুই দফা মৃদু ভূমিকম্প রেকর্ড করা হয়েছে—মাত্রা ছিল ৩.৩ ও ৪.৩, যার উৎস ছিল নরসিংদীর পলাশ উপজেলায়।

কেন হঠাৎ নরসিংদী বড় ভূমিকম্পের কেন্দ্রবিন্দু হলো?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ সৈয়দ হুমায়ুন আখতার ব্যাখ্যা দিয়েছেন—এই ভূমিকম্পের মূল কারণ ইন্ডিয়ান প্লেট এবং বার্মিজ প্লেটের দীর্ঘমেয়াদি টেকটোনিক চাপ। পৃথিবীর ভূ-পৃষ্ঠ টেকটোনিক প্লেটে বিভক্ত এবং এই প্লেটগুলো একে অপরকে ধাক্কা দেওয়ার সময় শক্তির সঞ্চয় হয়।

তার মতে, নরসিংদী অঞ্চলে প্লেট দুটি বহুদিন ধরে লকড অবস্থায় ছিল। শুক্রবার সেই লকড অংশের একটি ক্ষুদ্র অংশ খুলে শক্তি বের হয়ে আসে—এ কারণেই ভূমিকম্পটি এত শক্তিশালী ছিল।

বিশেষজ্ঞের ভাষায়:“এটি বড় বিপদের আগমনী বার্তা। সামান্য শক্তি বেরিয়ে আসা মানে ভবিষ্যতে আরও বড় ভূমিকম্পের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।”

৮০০ বছরের জমা শক্তি: সামনে কি বড় কম্পন?

ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নরসিংদীর সাথে যুক্ত প্লেট-সীমান্তে ৮০০ বছরের বেশি সময় ধরে শক্তি জমছে, যা ৮.২ থেকে ৯ মাত্রার ভয়াবহ ভূমিকম্প তৈরির ক্ষমতা রাখে। এই শক্তি বের হলে ভয়ংকর ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে, বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ ঢাকা শহরে।

হুমায়ুন আখতার জানান:“এই অঞ্চলে বড় ভূমিকম্প হলে ঢাকা শহর বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে। এখনই ঢাকাকে ভূমিকম্প-সহনীয় নগরীতে রূপান্তর না করলে ভয়াবহ পরিণতি এড়ানো যাবে না।”

অতীতের প্রমাণ: বড় ভূমিকম্পে নদীর গতিপথও বদলে গেছে

বাংলাদেশের ইতিহাসে ভূমিকম্পের কারণে বড় ধরনের ভৌগোলিক পরিবর্তনের নজির রয়েছে।

১৭৯৭ সালের ভূমিকম্পে ব্রহ্মপুত্র নদ তার গতিপথ পাল্টে নেয়।

১৭৬২ সালে ৮.৫ মাত্রার ভূমিকম্পে সেন্টমার্টিন দ্বীপ প্রায় ৩ মিটার উঁচু হয়ে ওঠে।

সিলেট–চট্টগ্রাম অঞ্চলে গত শতাব্দীতে ৭.৫–৭.৬ মাত্রার একাধিক ভূমিকম্প হয়েছে।

১৮৯৭ সালের ডাউকি ফল্টের ভূমিকম্প (৮.৭ মাত্রা) ভারতের ও বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ এলাকা ধ্বংস করে দেয়।

এই উদাহরণগুলো দেখায় যে বাংলাদেশ ভূমিকম্প-সঞ্চয়ী অঞ্চলে অবস্থান করছে এবং বড় ভূমিকম্পের ঝুঁকি দীর্ঘদিন ধরেই বিদ্যমান।

এখন কী করা জরুরি?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন:

ঢাকার ভবন কাঠামো দ্রুত ভূমিকম্প-সহনীয় করতে হবে

জরুরি উদ্ধার ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রয়োজন

মানুষের সচেতনতা বাড়ানো জরুরি

স্কুল–কলেজে ভূমিকম্প মহড়া বাধ্যতামূলক করা উচিত

কারণ নরসিংদীর ভূমিকম্পটি স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে—এখন আর সময় নষ্ট করার সুযোগ নেই।

পাঠকের মতামত:

সর্বোচ্চ পঠিত