ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬, ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

বাংলাদেশের ভূমিকম্প ঝুঁকি ও সম্ভাব্য আর্থিক বিপর্যয়: বিশ্লেষণ, সতর্কবার্তা ও করণীয়

২০২৫ নভেম্বর ২৩ ০৮:০৮:২৯

বাংলাদেশের ভূমিকম্প ঝুঁকি ও সম্ভাব্য আর্থিক বিপর্যয়: বিশ্লেষণ, সতর্কবার্তা ও করণীয়

বাংলাদেশ একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ–প্রবণ দেশ। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন বা খরার মতো দুর্যোগের সঙ্গে নিয়মিত লড়াই করে দেশের মানুষ। তবে ভূমিকম্পের ঝুঁকি অন্যান্য দুর্যোগের তুলনায় আলাদা—এটি আকস্মিক, তীব্র এবং মুহূর্তের মধ্যে বিপুল ক্ষয়ক্ষতি ঘটাতে সক্ষম। প্রস্তুতির সুযোগ কম হওয়ায় ক্ষতি প্রতিরোধ করা কঠিন, কিন্তু যথাযথ ব্যবস্থাপনায় ক্ষয়ক্ষতি অনেক কমানো সম্ভব।

কেন বাংলাদেশ ভূমিকম্পের উচ্চঝুঁকিতে?

দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে অবস্থিত বাংলাদেশ। ভারতীয়, বার্মিজ ও ইউরেশীয় টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলের কাছাকাছি হওয়ায় এ দেশে মাঝারি থেকে বড় মাত্রার ভূমিকম্পের ঝুঁকি প্রবল।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুসারে, গত এক শতকে দেশে ২০০টিরও বেশি ভূমিকম্প সংঘটিত হয়েছে। প্রতি বছর ২৫–৩০টি ক্ষুদ্র কম্পন রেকর্ড করা যায়, যা সিলেট, চট্টগ্রাম ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে তুলনামূলক বেশি।

সাম্প্রতিক ভূমিকম্পগুলো দেশের জন্য এক ধরনের প্রাকৃতিক সতর্কবার্তা হিসেবে এসেছে।

জাইকার একটি গবেষণায় উল্লেখ করা হয়—ঢাকায় যদি ৭.৫ মাত্রার ভূমিকম্প ঘটে, তবে শহরের ৭০% ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, প্রাণহানি হতে পারে দুই লাখের বেশি, আর আর্থিক ক্ষতি দাঁড়াতে পারে ৩০–৫০ বিলিয়ন ডলার।

ঢাকার ঘনবসতি, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও দুর্বল অবকাঠামো ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

সম্ভাব্য আর্থিক ক্ষতির চিত্র

একটি বড় ভূমিকম্প দেশের অর্থনীতিকে কয়েক বছর পর্যন্ত পঙ্গু করে দিতে পারে। বিশেষজ্ঞদের হিসাব মতে—

৩–৫ ট্রিলিয়ন টাকার আর্থিক ক্ষতি হতে পারে

সেতু, ফ্লাইওভার, রাস্তা, স্কুল, হাসপাতালসহ অবকাঠামোর ব্যাপক ধ্বংস

বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি সরবরাহ ব্যবস্থার ভেঙে পড়া

গার্মেন্টস শিল্পে উৎপাদন বন্ধ হয়ে রপ্তানিতে ব্যাপক ক্ষতি

ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অঞ্চলে স্থবিরতা

ব্যাংকিং ও বীমা খাতও চরম ঝুঁকিতে

ঋণ পরিশোধে অক্ষমতা বাড়বে

খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি পাবে

বীমা কোম্পানিগুলো বড় ক্ষতির দায় সামলাতে পারবে না

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এ ক্ষতি দেশের জিডিপির ১০–১৫% পর্যন্ত কমিয়ে দিতে পারে।

ক্ষতি কমাতে করণীয়

ভূমিকম্পকে থামানো সম্ভব নয়। কিন্তু সঠিক প্রস্তুতি থাকলে ক্ষতি অর্ধেকে নামানো যায়।

সরকারি পর্যায়ের জরুরি পদক্ষেপ

বাংলাদেশ জাতীয় বিল্ডিং কোড (BNBC) কঠোরভাবে বাস্তবায়ন

পুরনো ভবন বিশেষত স্কুল, হাসপাতাল ও সরকারি ভবনের ঝুঁকি মূল্যায়ন

ভূমিকম্প–মনিটরিং সিস্টেম সম্প্রসারণ

ফায়ার সার্ভিস, সিভিল ডিফেন্স ও সেনাবাহিনীকে আধুনিক যন্ত্রপাতি ও প্রশিক্ষণ প্রদান

স্কুল-অফিসে নিয়মিত ভূমিকম্প মহড়া চালু করা

গণমাধ্যম ও জনসচেতনতা কর্মসূচি জোরদার করা

রিয়েল এস্টেট খাতের ভূমিকা

ভূমিকম্প সহনীয় নকশা ও মানসম্মত নির্মাণ

জিও–টেকনিক্যাল টেস্ট ছাড়া ভিত্তি স্থাপন না করা

ইঞ্জিনিয়ার ও তদারকি টিম বাধ্যতামূলক করা

ক্রেতাকে ব্যবহৃত উপকরণের তথ্য স্বচ্ছভাবে জানানো

জাপানের অভিজ্ঞতা: বাংলাদেশের শিক্ষণীয় বিষয়

জাপান পৃথিবীর সবচেয়ে ভূমিকম্পপ্রবণ দেশগুলোর একটি হলেও ক্ষয়ক্ষতি কম। কারণ সেখানে—

কঠোর বিল্ডিং কোড

অত্যাধুনিক সতর্কীকরণ ব্যবস্থা

নিয়মিত মহড়া ও সচেতনতা

উন্নত প্রযুক্তি

শক্তিশালী দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা

বাংলাদেশ যদি একই ধরনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারে, তবে বড় ভূমিকম্পের ক্ষতি ৫০%–এর বেশি কমানো সম্ভব।

পাঠকের মতামত:

সর্বোচ্চ পঠিত