ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬, ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

বেরিয়ে এলো চাঞ্চল্যকর তথ্য,  হাদিকে যে প্রস্তাব দিয়েছিল ফয়সাল

২০২৫ ডিসেম্বর ২২ ১৮:৪১:৩৭

বেরিয়ে এলো চাঞ্চল্যকর তথ্য,  হাদিকে যে প্রস্তাব দিয়েছিল ফয়সাল

শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ড কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না, বরং এটি ছিল বিদেশ থেকে আসা একটি বিশেষ ঘাতক দলের অত্যন্ত নিখুঁত ও পেশাদার ‘অপারেশন’। তদন্ত সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, এই হত্যাকাণ্ডের মূল মাস্টারমাইন্ড ফয়সাল করিম মাসুদ অত্যন্ত সুকৌশলে হাদির বিশ্বস্ততা অর্জন করেছিল কেবল তাকে হত্যা করার লক্ষ্যেই।

সখ্যতার আড়ালে অনুপ্রবেশ: ৭ দিনের সেই ছকতদন্তে জানা গেছে, গত ৪ ডিসেম্বর প্রথমবারের মতো হাদির ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারে সহযোগী কবিরকে নিয়ে হাজির হয় ফয়সাল। মাত্র ৬ মিনিটের সেই বৈঠকে সে নিজেকে হাদির একজন বড় অনুরাগী হিসেবে তুলে ধরে। এর ঠিক ৫ দিন পর, ৯ ডিসেম্বর রাতে পুনরায় হাদির কাছে গিয়ে নিজেকে নির্বাচনী প্রচারণার একজন দক্ষ কারিগর হিসেবে পরিচয় দেয় ফয়সাল। সরল বিশ্বাসে হাদি তাকে নিজের নির্বাচনী টিমে অন্তর্ভুক্ত করে নেন। ১০ ডিসেম্বর সেগুনবাগিচায় সরাসরি হাদির সাথে প্রচারণায় অংশ নিয়ে ফয়সাল তার গতিবিধি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা রেকি করে।

রিসোর্টে ‘হেডশট’-এর ঘোষণা:হামলার চূড়ান্ত প্রস্তুতির জন্য ফয়সাল সাভার, মানিকগঞ্জ ও নরসিংদীর বিভিন্ন নির্জন এলাকায় প্রশিক্ষণ ও রেকি সম্পন্ন করে। ১৩ ডিসেম্বর হামলার দিন ভোরে সাভারের ‘গ্রিন জোন’ রিসোর্টে তার বান্ধবী ও সঙ্গীদের সামনে হাদির একটি ভিডিও দেখিয়ে ফয়সাল দম্ভভরে ঘোষণা করেছিল—সে হাদির মাথায় গুলি করে দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করবে। এমনকি খুনের পর ডিজিটাল তথ্য প্রমাণের চিহ্ন কীভাবে মুছে ফেলতে হবে, তার নির্দেশনাও সে সেখানেই দিয়েছিল।

১৩ ডিসেম্বরের রক্তক্ষয়ী দুপুর: ঘাতকের পিছু নেওয়াগোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, ১৩ ডিসেম্বর বেলা ১১টা ৫ মিনিটে ফয়সাল তার আগারগাঁওয়ের বাসা থেকে মোটরসাইকেলে বের হয়। এরপরের ঘটনাপ্রবাহ ছিল রুদ্ধশ্বাস:

বেলা ১১টা ৪৫ মিনিট: ফয়সাল সেগুনবাগিচায় হাদির সাথে প্রচারণায় যোগ দিয়ে ছায়ার মতো লেগে থাকে।

দুপুর ১২টা ২২ মিনিট: প্রচারণা শেষে হাদি অটোরিকশায় করে মতিঝিলের দিকে রওনা দিলে ফয়সাল মোটরসাইকেলে তাকে অনুসরণ করে।

দুপুর ১২টা ৫০ মিনিট: হাদি মতিঝিল জামিয়া দারুল উলুম মসজিদে নামাজ পড়তে ঢুকলে ফয়সাল বাইরে ও ভেতরে নজরদারি চালায়।

দুপুর ২টা ২৪ মিনিট: নামাজ শেষে হাদি যখন পল্টনের বক্স কালভার্ট রোডের একটি নিরিবিলি জায়গায় পৌঁছান, ঠিক তখনই পেছন থেকে খুব কাছ থেকে তাকে লক্ষ্য করে দুটি গুলি ছোড়ে ফয়সাল।

মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা ও নক্ষত্র পতন:গুলিবিদ্ধ হাদিকে সংকটজনক অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল ও পরে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় ১৫ ডিসেম্বর তাকে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়। সেখানে ৫ দিন লড়াই করার পর ১৮ ডিসেম্বর শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন এই তরুণ নেতা। পরে তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়।

পলাতক খুনি ও পরবর্তী পদক্ষেপ:হত্যাকাণ্ড ঘটানোর মাত্র ১২ ঘণ্টার মধ্যে ফয়সাল দেশ ছাড়তে সক্ষম হয় বলে গোয়েন্দারা নিশ্চিত হয়েছেন। ঘাতক ফয়সালকে দেশে ফিরিয়ে আনতে বর্তমানে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের সহায়তা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে আর কোনো বড় রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী মহলের ইন্ধন রয়েছে কিনা, তা খুঁজে বের করাই এখন তদন্তকারীদের মূল চ্যালেঞ্জ।

পাঠকের মতামত:

সর্বোচ্চ পঠিত