ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬, ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

প্রবাসে মৃ‘ত্যু: লাশ দেশে পাঠানোর সময় কি সত্যিই নাড়িভুঁড়ি বের করা হয়? জানুন আসল সত্য

২০২৫ ডিসেম্বর ২৪ ১৭:৩২:৫০

প্রবাসে মৃ‘ত্যু: লাশ দেশে পাঠানোর সময় কি সত্যিই নাড়িভুঁড়ি বের করা হয়? জানুন আসল সত্য

সৌদি আরবে কোনো বাংলাদেশি বা বিদেশি প্রবাসী মারা গেলে তাঁর মরদেহ দেশে পাঠানোর প্রক্রিয়াটি বেশ জটিল এবং কয়েকটি ধাপের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। আপনার মনে যে প্রশ্নটি জেগেছে—"লাশের নাড়ি বের করা হয় কি না?"—এর উত্তর হচ্ছে, এটি একটি আংশিক সত্য কিন্তু সাধারণ মানুষের বর্ণনায় এটি কিছুটা বীভৎসভাবে উপস্থাপিত হয়। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এই প্রক্রিয়াটিকে বলা হয় ‘এমবামিং’ (Embalming)।

১. নাড়ি বের করার বিষয়টি আসলে কী?

আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল আইন অনুযায়ী, কোনো মৃতদেহ এক দেশ থেকে অন্য দেশে পাঠাতে হলে সেটিকে পচনরোধী ব্যবস্থা বা এমবামিং করতে হয়। এই প্রক্রিয়ায় লাশের পচনশীল অংশগুলো (যেমন—রক্ত এবং পাকস্থলী বা অন্ত্রের ভেতরের বর্জ্য) বিশেষ পাম্পের মাধ্যমে বের করে নেওয়া হয় এবং সেখানে ফরমালিনসহ বিভিন্ন রাসায়নিক তরল প্রবেশ করানো হয়। এটি করা হয় যাতে বিমানে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার সময় লাশের পচন না ধরে, দুর্গন্ধ না ছড়ায় বা কোনো জীবাণু সংক্রমণ না ঘটে। সাধারণ মানুষ একেই 'নাড়ি বের করা' বলে ভুল বুঝে থাকেন। এটি কোনো অঙ্গহানি নয়, বরং একটি বৈজ্ঞানিক সংরক্ষণ পদ্ধতি।

২. কেন এই প্রক্রিয়াটি জরুরি?

মৃতদেহ পচনের মূল কারণ হলো শরীরের ভেতরে থাকা ব্যাকটেরিয়া এবং তরল বর্জ্য। আকাশপথে দীর্ঘ সময় (কখনো ১০-২০ ঘণ্টা) লাশ ট্রানজিটে থাকতে পারে। রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার করে পচন রোধ না করলে লাশ ফুলে যেতে পারে বা ফেটে যেতে পারে, যা বিমানের স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য হুমকিস্বরূপ। তাই এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ এমবামিং সার্টিফিকেট ছাড়া লাশ গ্রহণ করে না।

৩. ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি ও বাস্তবতা:

ইসলামি শরীয়াহ অনুযায়ী, মৃতদেহ দ্রুত দাফন করা উত্তম এবং যেখানে মৃত্যু হয়েছে সেখানেই দাফন করার পরামর্শ দেওয়া হয়। কিন্তু যদি পরিবার মরদেহ দেশে ফেরত চায়, তবে বিমানে পাঠানোর জন্য ওই দেশের রাষ্ট্রীয় আইন এবং আন্তর্জাতিক বিমান আইন মানা বাধ্যতামূলক হয়ে পড়ে। সৌদি আরবের বড় বড় সরকারি হাসপাতালের মর্গে দক্ষ চিকিৎসকদের মাধ্যমে এই এমবামিং প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করা হয়।

৪. কোনো অঙ্গ কি কেটে রাখা হয়?

না, এটি একটি ভুল ধারণা। কোনো ব্যক্তির স্বাভাবিক মৃত্যু হলে তাঁর কোনো অঙ্গ কেটে রাখা বা বের করে নেওয়ার কোনো নিয়ম নেই। শুধুমাত্র যদি ময়নাতদন্তের (Autopsy) প্রয়োজন হয় (যেমন—দুর্ঘটনা বা অস্বাভাবিক মৃত্যু), তবে অভ্যন্তরীণ কিছু পরীক্ষা করা হয়। তবে সেটিও অত্যন্ত পেশাদারিত্বের সাথে করা হয় এবং পরীক্ষা শেষে শরীর যথাযথভাবে সেলাই করে দেওয়া হয়।

৫. কফিন ও সিলগালা:

এমবামিং করার পর মরদেহটি একটি কফিনে রাখা হয় এবং দস্তা বা সিসার পাত দিয়ে (Zinc-lined coffin) এয়ারটাইট বা বায়ুরোধী করে সিলগালা করে দেওয়া হয়। এরপর দূতাবাস এবং বিমানবন্দরের যাবতীয় ছাড়পত্র নিয়ে মরদেহ বাংলাদেশে পাঠানো হয়।

সহজ কথায়, লাশের পেট কেটে নাড়িভুঁড়ি বের করে ফেলে দেওয়া হয় না। বরং লাশের পচন রোধে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে শরীর থেকে পচনশীল তরল ও বর্জ্য অপসারণ করে রাসায়নিক দিয়ে সংরক্ষণ করা হয়। এটি একটি আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন চিকিৎসা পদ্ধতি।

পাঠকের মতামত:

সর্বোচ্চ পঠিত