ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬, ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

বিশ্বকাপে ‘নীরব শোষণ’, আইসিসির শর্তে ক্ষুব্ধ ক্রিকেটবিশ্ব

২০২৬ জানুয়ারি ২৯ ১৯:০৬:৪১

বিশ্বকাপে ‘নীরব শোষণ’, আইসিসির শর্তে ক্ষুব্ধ ক্রিকেটবিশ্ব

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশ নিতে যাওয়া প্রায় ৯০ জন খেলোয়াড়ের অধিকার ও সুরক্ষা খর্ব হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এদের অধিকাংশই তুলনামূলক খর্বশক্তির দলগুলোর খেলোয়াড়। পরিস্থিতি এমন হতে পারে যে, এই দলগুলোর খেলোয়াড়দের সীমাহীন সংখ্যক কনটেন্ট কার্যক্রমে অংশ নিতে বাধ্য করা হবে এমনকি লাইসেন্সিং চুক্তি নিয়েও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা থাকবে না—সব ক্ষমতা থাকবে সংশ্লিষ্ট জাতীয় বোর্ডের হাতে।

এই উদ্বেগের বিষয়গুলো বিশ্ব ক্রিকেটার্স অ্যাসোসিয়েশন (ডব্লিউসিএ) অন্তত ছয়টি সদস্য দেশের কাছে পাঠানো একটি স্মারকলিপিতে তুলে ধরেছে। অভিযোগ করা হয়েছে, ২০ দল নিয়ে ফেব্রুয়ারিতে শুরু হতে যাওয়া বিশ্বকাপের আগে আইসিসি কিছু দলের কাছে অনুমোদনহীন ‘স্কোয়াড টার্মস’ পাঠিয়েছে। ক্রিকেটভিত্তিক সাইট ক্রিকবাজের হাতে আসা ওই স্মারকলিপিতে বলা হয়েছে, আইসিসির পাঠানো ‘আইসিসি ভার্সন’ স্কোয়াড টার্মস এবং ডব্লিউসিএ অনুমোদিত শর্তাবলীর মধ্যে স্পষ্ট অমিল রয়েছে। বৈশ্বিক ক্রিকেটার্স ইউনিয়নের দাবি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র, জিম্বাবুয়ে ও নামিবিয়াসহ একাধিক দল এই নথি পেয়েছে।

স্মারকলিপিতে বলা হয়েছে, ‘অনুমোদনহীন স্কোয়াড টার্মস ছড়িয়ে দেওয়া আইসিসি ও কিছু জাতীয় ক্রিকেট বোর্ডের একটি প্রচেষ্টা বলেই মনে হচ্ছে, যার মাধ্যমে এই বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া সবচেয়ে দুর্বল ও কম পারিশ্রমিকপ্রাপ্ত খেলোয়াড়দের শোষণ করা হচ্ছে। এদের মধ্যে কেউ কেউ অপেশাদার খেলোয়াড়। এসব শর্তের আওতায় খেলোয়াড়দের তথ্য, নাম, ছবি ও পরিচিতি তৃতীয় পক্ষের কাছে প্রায় সীমাহীনভাবে ব্যবহার ও বাণিজ্যিকভাবে কাজে লাগানোর সুযোগ রাখা হয়েছে খেলোয়াড়দের সম্মতি ছাড়াই। একমাত্র প্রতিকার হিসেবে রাখা হয়েছে আইসিসির নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত একটি অভ্যন্তরীণ বিরোধ নিষ্পত্তি প্রক্রিয়া।’

এখানে ‘স্কোয়াড টার্মস’ বলতে বোঝানো হয়েছে এমন একটি আইনি চুক্তিকে, যেখানে প্রতিটি আইসিসি ইভেন্টে একজন খেলোয়াড়ের জন্য প্রযোজ্য শর্তাবলি ও নিয়মকানুন নির্ধারিত থাকে। ডব্লিউসিএর আশঙ্কা, আইসিসির বর্তমান সংস্করণে ইচ্ছাকৃতভাবে বিরোধ নিষ্পত্তি প্রক্রিয়ায় থাকা সব ধরনের চেক অ্যান্ড ব্যালান্স (ক্ষমতার ভারসাম্য ও নিয়ন্ত্রণ) বাদ দেওয়া হয়েছে—যে সুরক্ষা খেলোয়াড়রা ডব্লিউসিএ অনুমোদিত বৈধ স্কোয়াড টার্মসে স্বাক্ষর করলে পেতেন।

স্কটল্যান্ড যুক্ত হওয়ায় এবার টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ডব্লিউসিএ-সংশ্লিষ্ট দেশের সংখ্যা ১৪-তে পৌঁছেছে। তবে সংস্থাটির প্রধান দুশ্চিন্তা হলো, আইসিসির সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে গড়ে তোলা সুরক্ষা ব্যবস্থাগুলো যেন কোনোভাবেই দুর্বল না হয়ে পড়ে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হিসেবে উল্লেখ করা জয়ে দুর্বল ও কম পারিশ্রমিকপ্রাপ্ত খেলোয়াড় দলগুলোকে বিশেষভাবে টার্গেট করা হয়েছে এবং তাদের অন্য দলগুলোর তুলনায় ভিন্ন শর্তে খেলতে বলা হচ্ছে। স্কোয়াড টার্মসের দুই সংস্করণের মধ্যে অসামঞ্জস্য সামগ্রিক হলেও, কিছু নির্দিষ্ট বিষয় বেশ চোখে পড়ে। যেমন, আইসিসির চেঞ্জিং রুমে রেকর্ডিং কন্টেন্টের অ্যাক্সেস। ডব্লিউসিএ অনুমোদিত চুক্তিতে, এটি শুধুমাত্র জয়ী দলের জন্য এবং অধিনায়কের অনুমোদনের সময় অনুযায়ী সীমিত। আইসিসির সংস্করণে, ম্যাচের পর সব দলের চেঞ্জিং রুমে ‘যুক্তিসঙ্গত অ্যাক্সেস’ থাকবে, এবং অনুমতি পেতে শুধু টিম ম্যানেজারের সম্মতি যথেষ্ট।

একইভাবে, মাঠের বাইরের বা ‘বিহাইন্ড দ্য সিনস’ কনটেন্টের ক্ষেত্রেও বড় পার্থক্য রয়েছে। আইসিসির মডেলে, সম্ভাব্য ইভেন্ট ডকুমেন্টারির জন্য দলের সব কার্যক্রমের কনটেন্ট আরও বিস্তৃতভাবে ব্যবহার করার সুযোগ রাখা হয়েছে। বিপরীতে, ডব্লিউসিএর সংস্করণে যেকোনো ধরনের ডকুমেন্টারির জন্য খেলোয়াড়দের সম্মতি বাধ্যতামূলক এবং যেহেতু এটি লাইসেন্সপ্রাপ্ত পণ্য, তাই এর বিনিময়ে অর্থ প্রদানের কথাও স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে।

দুই স্কোয়াড টার্মসের আরেকটি বড় পার্থক্য হলো খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত তথ্যের মালিকানা। ডব্লিউসিএ অনুমোদিত সংস্করণে খেলোয়াড় নিজেই তার তথ্যের মালিক এবং সেটি ব্যবহার করতে হলে অবশ্যই তার সম্মতি প্রয়োজন। কিন্তু আইসিসির সংস্করণে খেলোয়াড়ের সব তথ্য পূর্ণ মালিকানা দেওয়া হয়েছে সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে, যারা জাতীয় বোর্ডের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে সেই তথ্য বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করতে পারবে।

এছাড়া আইসিসির সংস্করণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—একবার কোনো খেলোয়াড় আইসিসির কোনো ইভেন্টে অংশ নিলে, সে চুক্তিতে সই করুক বা না করুক, তাকে স্কোয়াড টার্মসের সব শর্ত মেনে নিয়েছে বলে ধরে নেওয়া হবে। বিপরীতে, ডব্লিউসিএর সংস্করণে প্রতিটি আইসিসি ইভেন্টের জন্য আলাদাভাবে চুক্তিতে সই করাকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

সবকিছু মিলিয়ে ডব্লিউসিএর প্রধান নির্বাহী টম মফ্যাটের ভাষায়, ‘ডব্লিউসিএর সংস্করণটি তুলনামূলকভাবে বেশি ভারসাম্যপূর্ণ, যেখানে খেলোয়াড়দের মতামতের গুরুত্ব বেশি এবং পুরো প্রক্রিয়াটি স্বাধীন।’

পাঠকের মতামত:

সর্বোচ্চ পঠিত