ঢাকা, সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬, ৫ শ্রাবণ ১৪৩৩

সৌদি আরবের কোম্পানি ভিসা : প্রবাস জীবনের নতুন দিগন্ত

২০২৫ অক্টোবর ৩১ ০০:১৮:০১

সৌদি আরবের কোম্পানি ভিসা : প্রবাস জীবনের নতুন দিগন্ত

বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার বহু মানুষের স্বপ্নের গন্তব্য এখন সৌদি আরব। ভালো বেতন, আধুনিক কর্মপরিবেশ ও স্থিতিশীল জীবনযাত্রার কারণে দেশটি দীর্ঘদিন ধরেই প্রবাসী শ্রমবাজারে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান দখল করে আছে। বর্তমানে সৌদি আরব তাদের অর্থনীতিকে ‘ভিশন ২০৩০’ উদ্যোগের মাধ্যমে বহুমুখী করছে। পেট্রোলিয়ামনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে এসে দেশটি বিনিয়োগ করছে নির্মাণ, তথ্যপ্রযুক্তি, স্বাস্থ্য ও পর্যটন খাতে। এর ফলে সৃষ্টি হয়েছে হাজার হাজার নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ, আর সেই সুযোগের মূল চাবিকাঠি হচ্ছে কোম্পানি ভিসা।

সৌদি আরবের কোম্পানি ভিসা হলো এমন একটি কর্মভিসা, যার মাধ্যমে বিদেশি কর্মীরা নির্দিষ্ট কোনো কোম্পানির অধীনে কাজ করতে পারেন। এই ভিসার বৈধতা, নবায়ন ও অন্যান্য প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির দায়িত্বে সম্পন্ন হয়। সাধারণভাবে এই ভিসার কয়েকটি ধরন রয়েছে—ওয়ার্ক ভিসা, প্রফেশনাল ভিসা, বিজনেস ভিসা এবং ফ্যামিলি ভিসা। ওয়ার্ক ভিসা সাধারণ শ্রমিক ও কর্মচারীদের জন্য, প্রফেশনাল ভিসা দেওয়া হয় দক্ষ পেশাজীবীদের যেমন ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার বা আইটি বিশেষজ্ঞদের জন্য। বিজনেস ভিসা ব্যবসায়িক সফর বা বিনিয়োগ সংক্রান্ত কাজে ব্যবহৃত হয় এবং ফ্যামিলি ভিসা পাওয়া যায় সৌদিতে কর্মরত ব্যক্তির পরিবারের সদস্যদের স্পনসর করার জন্য।

কোম্পানি ভিসার আবেদন প্রক্রিয়া প্রথমে জটিল মনে হলেও সঠিক তথ্য জানলে তা বেশ সহজ হয়ে যায়। প্রথমে অনলাইন জব পোর্টাল বা অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে উপযুক্ত কোম্পানি নির্বাচন করতে হয়। এরপর কোম্পানি থেকে একটি লিখিত অফার লেটার সংগ্রহ করতে হয়, যেখানে বেতন, কাজের সময় ও সুযোগ-সুবিধার বিবরণ উল্লেখ থাকে। সাধারণত এক থেকে তিন মাসের মধ্যে ভিসা অনুমোদন পাওয়া যায়। কোম্পানির পক্ষ থেকে সৌদি শ্রম মন্ত্রণালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ভিসা অথরাইজেশন নম্বর ইস্যু করা হয়। এরপর বাংলাদেশে অবস্থিত সৌদি দূতাবাস বা ভিসা সেন্টারে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়ে ভিসা স্ট্যাম্প করতে হয়।

ভিসা প্রক্রিয়ায় প্রয়োজন হয় বৈধ পাসপোর্ট (কমপক্ষে ছয় মাস মেয়াদসহ), ভিসা অথরাইজেশন নম্বর, চাকরির অফার লেটার বা কনট্রাক্ট, অনুমোদিত মেডিকেল সেন্টারের মেডিকেল রিপোর্ট, পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট, শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ (যদি প্রযোজ্য হয়), সাদা ব্যাকগ্রাউন্ডে ছবি এবং ই-রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট (বাংলাদেশিদের জন্য বাধ্যতামূলক)।

সৌদি আরবে বেতন নির্ধারিত হয় কাজের ধরন, যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে। সাধারণ শ্রমিকরা মাসে গড়ে ৪৫,০০০ থেকে ৭৫,০০০ টাকা পর্যন্ত আয় করতে পারেন, দক্ষ শ্রমিকদের বেতন ৫৪,০০০ থেকে ৯০,০০০ টাকার মধ্যে। টেকনিশিয়ানদের আয় ৬৬,০০০ থেকে ১,০৫,০০০ টাকা, সুপারভাইজারদের ৭৫,০০০ থেকে ১,২০,০০০ টাকা, আর ড্রাইভারদের বেতন ৬০,০০০ থেকে ৯৬,০০০ টাকার মধ্যে। ইঞ্জিনিয়ারদের বেতন ১,২০,০০০ থেকে ২,১০,০০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে, ডাক্তার ও বিশেষজ্ঞদের ১,৫০,০০০ থেকে ৩,০০,০০০ টাকা, আর ম্যানেজার বা প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের বেতন ১,৮০,০০০ থেকে ৩,৬০,০০০ টাকার মধ্যে হয়ে থাকে।

অতিরিক্ত সুবিধার মধ্যে বেশিরভাগ কোম্পানি কর্মীদের জন্য বিনা মূল্যে আবাসন, খাবার, পরিবহন, চিকিৎসা সুবিধা, বাৎসরিক ছুটি এবং রিটার্ন টিকিট প্রদান করে। এতে কর্মীদের মাসিক ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। সাধারণত সৌদি আরবে নিজস্ব আবাসনের ভাড়া মাসে ৩২,০০০ থেকে ৯০,০০০ টাকা, খাবারের ব্যয় প্রায় ২০,০০০ টাকা এবং পরিবহন খরচ ৬,০০০ থেকে ১০,০০০ টাকার মধ্যে। তবে কোম্পানির প্রদত্ত সুবিধা থাকলে এই ব্যয় অনেক কমে আসে।

ভিশন ২০৩০-এর আওতায় সৌদি আরবের অর্থনীতি দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। নতুন শিল্প, স্মার্ট সিটি ও মেগা প্রকল্পগুলোর কারণে দক্ষ জনশক্তির চাহিদা বেড়ে চলেছে, ফলে বেতনও ক্রমেই বাড়ছে—বিশেষত দক্ষ ও প্রফেশনাল কর্মীদের ক্ষেত্রে। বর্তমানে নির্মাণ শ্রমিক, প্রকৌশলী, আইটি বিশেষজ্ঞ, স্বাস্থ্যকর্মী ও পেট্রোলিয়াম-গ্যাস টেকনিশিয়ানদের চাহিদা সর্বাধিক।

কোম্পানি ভিসার মেয়াদ শেষ হলে নিয়োগদাতা কোম্পানির মাধ্যমে সহজেই তা নবায়ন করা যায়। সৌদি সরকারের নির্ধারিত নিয়মে অনলাইন প্রক্রিয়ায় এই নবায়ন সম্পন্ন হয়। ফলে একবার চাকরি পেলে নিয়ম মেনে ভিসা নবায়ন করে দীর্ঘ সময় কাজ করার সুযোগ থাকে।

সবশেষে বলা যায়, সৌদি আরবের কোম্পানি ভিসা এখন বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের জন্য এক বড় সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। ভিশন ২০৩০-এর যুগে এই দেশটি হয়ে উঠছে নতুন প্রবাসী স্বপ্নের ঠিকানা—যেখানে পরিশ্রম ও দক্ষতাই ভবিষ্যতের সাফল্যের আসল চাবিকাঠি।

পাঠকের মতামত:

সর্বোচ্চ পঠিত