ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬, ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

ভিসা নিষেধাজ্ঞা ও অনাস্থা: সংকটে বাংলাদেশি পাসপোর্ট

২০২৫ অক্টোবর ২৬ ০০:১০:৫৩

ভিসা নিষেধাজ্ঞা ও অনাস্থা: সংকটে বাংলাদেশি পাসপোর্ট

বিশ্বজুড়ে ক্রমেই আস্থা হারাচ্ছে বাংলাদেশের পাসপোর্ট। ভিসা নিষেধাজ্ঞা, মানবপাচার, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং কূটনৈতিক টানাপোড়েন—সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের পাসপোর্ট এখন অন্যতম দুর্বল অবস্থানে।

হেনলি সূচকে সপ্তম দুর্বলতম পাসপোর্ট

যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণা সংস্থা হেনলি অ্যান্ড পার্টনার্স প্রকাশিত ২০২৫ সালের পাসপোর্ট ইনডেক্সে বাংলাদেশ রয়েছে ১০০তম স্থানে—অর্থাৎ বিশ্বের সপ্তম দুর্বলতম পাসপোর্টধারী দেশ। বর্তমানে বাংলাদেশিরা মাত্র ৩৮টি দেশে ভিসামুক্ত বা অনঅ্যারাইভাল প্রবেশাধিকার পান।

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো—উত্তর কোরিয়া ও ফিলিস্তিনের মতো দেশও বাংলাদেশের ওপরে অবস্থান করছে।

কূটনৈতিক টানাপোড়েন ও ভিসা সংকট

২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্রনেতৃত্বাধীন আন্দোলনের পর শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকেই বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের কূটনৈতিক সম্পর্কের অবনতি ঘটে। এরপর নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে ভারত তাদের ভিসা সেবা অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করে। পরে সীমিতভাবে চিকিৎসা ও শিক্ষার্থী ভিসা চালু হলেও, পর্যটন ভিসা এখনো বন্ধ।

এছাড়া, সৌদি আরব, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর ও ভিয়েতনাম—এসব দেশও ভিসা প্রক্রিয়া কঠোর করেছে। শ্রীলঙ্কা আগাম ইলেকট্রনিক ট্রাভেল অথরাইজেশন (ETA) বাধ্যতামূলক করেছে।

ভ্রমণকারীরা বলছেন, এখন ভিসা পেতে সময় বেশি লাগছে, বাতিলের হার বেড়েছে, এমনকি বৈধ ভিসা নিয়েও ইমিগ্রেশনে ‘অফলোড’ হওয়ার ঘটনা ঘটছে।

ফেরত পাঠানো ও বিশ্বাস সংকট

২০২৪ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে অন্তত ৫০০’র বেশি বাংলাদেশি বিভিন্ন দেশ থেকে ফেরত পাঠানো হয়েছে।

কিরগিজস্তান ফেরত পাঠিয়েছে ১৮০ জন

যুক্তরাষ্ট্র ফেরত পাঠিয়েছে ১৮৭ জন

ইতালি, অস্ট্রিয়া, গ্রিস ও সাইপ্রাস থেকে এসেছে ৫২ জন

মালয়েশিয়া ও যুক্তরাজ্য থেকেও ফেরত এসেছে শতাধিক বাংলাদেশি

এই প্রবণতা আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের অভিবাসন ব্যবস্থার প্রতি আস্থা আরও কমিয়ে দিয়েছে।

মানবপাচার ও আন্তর্জাতিক রিপোর্ট

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ট্রাফিকিং ইন পারসন্স (TIP) রিপোর্ট ২০২৫ অনুযায়ী, বাংলাদেশ রয়েছে টায়ার-২ স্তরে—অর্থাৎ মানবপাচার প্রতিরোধে পর্যাপ্ত অগ্রগতি নেই।

প্রতিবেদনে বলা হয়, গত এক বছরে ৩,৪১০ জন বাংলাদেশি মানবপাচারের শিকার হয়েছেন, যার মধ্যে বেশিরভাগই জোরপূর্বক শ্রমে নিযুক্ত হয়েছেন।

আইনশৃঙ্খলা ও অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা

২০২৪ সালের মাঝামাঝি থেকে দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও মব সহিংসতা বেড়েছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যমতে, গত এক বছরে অন্তত ১৭৯ জন মব হামলায় নিহত হয়েছেন।

ফরেন সার্ভিস একাডেমির এক অনুষ্ঠানে প্রবাসী কল্যাণ উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেন—

“লাল পাসপোর্ট থাকলেও বাংলাদেশি পরিচয়ে বারবার সন্দেহের মুখে পড়তে হয়েছে। সাধারণ সবুজ পাসপোর্টধারীদের অবস্থা আরও খারাপ।”

পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন বলেন—

“বাংলাদেশিদের বিভিন্ন দেশে হেনস্তা হচ্ছে, কিন্তু শুধু বিদেশিরা দায়ী নয়—আমরাও দায়ী। পাসপোর্টের মূল্য কমে যাওয়ার পেছনে অভ্যন্তরীণ অনিয়মও বড় কারণ।”

বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আয়নুল ইসলাম মনে করেন—

“বাংলাদেশের ই-পাসপোর্ট এখনও আন্তর্জাতিক ডেটাবেসের সঙ্গে পুরোপুরি সংযুক্ত নয়। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা বেড়েছে, ফলে জালিয়াতি ও ভুয়া তথ্যের ব্যবহারও বেড়েছে।”

তিনি আরও যোগ করেন—

“২০২৪ সালের জুলাইয়ের পর থেকে আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা ইতিহাসে সর্বোচ্চ। তাই অনেক দেশ এখন বাংলাদেশিদের প্রবেশে বাড়তি সতর্কতা নিচ্ছে।”

পাঠকের মতামত:

সর্বোচ্চ পঠিত