ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬, ৮ শ্রাবণ ১৪৩৩

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা : ছয় সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ তেলের দাম

২০২৬ জুলাই ২৩ ১৩:০১:৫৫

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা : ছয় সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ তেলের দাম

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ক্রমবর্ধমান সামরিক উত্তেজনার প্রভাব এবার স্পষ্টভাবে পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে। নিরাপত্তা ঝুঁকি ও সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়ে ছয় সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছেছে। বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি ও বাব আল-মান্দেবের মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে উত্তেজনা আরও বাড়লে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সংকট তৈরি হতে পারে এবং তেলের দাম আরও ঊর্ধ্বমুখী হতে পারে।

বৃহস্পতিবারের বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১.৯৩ ডলার বা প্রায় ২ শতাংশ বেড়ে ৯৬ ডলারে পৌঁছেছে, যা গত ৮ জুনের পর সর্বোচ্চ। আগের কার্যদিবসেও ব্রেন্টের দাম ৩ ডলারের বেশি বেড়ে ৯৪.০৭ ডলারে লেনদেন শেষ হয়েছিল। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বেঞ্চমার্ক ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) অপরিশোধিত তেলের দাম ১.৪৪ ডলার বা ১.৭ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৮৮.২৭ ডলারে উঠেছে। বুধবারও এই সূচকে প্রায় ৩ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি হয়েছিল।

তেলের বাজারে এই ঊর্ধ্বগতির প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান সামরিক উত্তেজনাকে। মার্কিন সামরিক বাহিনীর দাবি, তারা টানা দ্বাদশ রাতেও ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। এর কয়েক ঘণ্টা আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালিতে কোনো মার্কিন বা মিত্র জাহাজে হামলা হলে কঠোর জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন। তিনি বলেন, এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, যেমন সেতু বা বিদ্যুৎকেন্দ্র লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে।

অন্যদিকে ইরানের ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ডস (আইআরজিসি) দাবি করেছে, হরমুজ প্রণালির দক্ষিণাঞ্চলে মাইন বিস্ফোরণে একটি তেলবাহী ট্যাংকারে আগুন লেগেছে এবং নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে আরও দুটি ট্যাংকারকে ফিরে যেতে হয়েছে। সংস্থাটি আরও দাবি করেছে, বর্তমানে হরমুজ প্রণালি তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং চলমান সামরিক পরিস্থিতিতে প্রণালিটি কার্যত বন্ধ রাখা হতে পারে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানের অনুমতি ছাড়া কোনো তেলবাহী জাহাজকে ওই নৌপথ দিয়ে প্রবেশ বা প্রস্থান করতে দেওয়া হবে না।

পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে ইয়েমেনভিত্তিক ইরান-সমর্থিত হুথি গোষ্ঠীর নতুন ঘোষণা। তারা লোহিত সাগরের বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে সৌদি আরবের তেলবাহী জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করার ঘোষণা দিয়েছে এবং সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধের হুমকিও দিয়েছে। গোষ্ঠীটির দাবি, তারা সৌদি আরবের দুটি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালিয়েছে। এছাড়া সতর্কবার্তার পর প্রায় ১০টি জাহাজকে ফিরে যেতে বাধ্য করার কথাও জানিয়েছে। তবে এসব দাবির স্বাধীন যাচাই তখনও সম্ভব হয়নি।

বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দুটি নৌপথ হরমুজ প্রণালি ও বাব আল-মান্দেব। প্রতিদিন বিশ্বের বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল এই দুটি রুট দিয়ে পরিবহন করা হয়। ফলে এসব এলাকায় সংঘাত বাড়লে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়, যা আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আরও বাড়িয়ে দিতে পারে বলে মনে করছেন জ্বালানি বিশ্লেষকরা।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (ইআইএ) জানিয়েছে, গত সপ্তাহে দেশটির অপরিশোধিত তেলের মজুদ প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল বেড়েছে। শোধনাগারের কার্যক্রম কিছুটা কমে যাওয়া, রপ্তানি হ্রাস এবং আমদানি বৃদ্ধির কারণে এই মজুদ বেড়েছে। অথচ বাজার বিশ্লেষকরা প্রায় ১১ লাখ ব্যারেল মজুদ কমার পূর্বাভাস দিয়েছিলেন। তবে মজুদ বাড়ার এই তথ্যও মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার প্রভাবকে ছাপিয়ে যেতে পারেনি; বরং বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টি এখন সম্ভাব্য সরবরাহ সংকটের দিকেই বেশি নিবদ্ধ রয়েছে।

পাঠকের মতামত:

সর্বোচ্চ পঠিত