ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬, ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

আইসিইউতে শিক্ষা : কে বাঁচাবে

২০২৬ জানুয়ারি ১৮ ০৮:৫৯:৩৬

আইসিইউতে শিক্ষা : কে বাঁচাবে

স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে গেলেও বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার মান এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। বরং সাম্প্রতিক সময়ে তা যেন গভীর সংকটে পড়েছে। রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, সড়ক অবরোধ, প্রশাসনিক অচলাবস্থা ও শিক্ষাঙ্গনে অস্থিরতা মিলিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থা কার্যত ‘আইসিইউতে’ চলে গেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

গত ১৫ জানুয়ারি ঢাকা কলেজসহ সাতটি সরকারি কলেজের শিক্ষার্থীরা সায়েন্সল্যাব মোড় অবরোধ করলে পুরো মিরপুর সড়ক অচল হয়ে পড়ে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে পড়ে সাধারণ মানুষ, রোগী ও জরুরি সেবার যানবাহন। এই একটি দিনই নয়—গত ১৭ মাসে রাজধানীতে হাজারের বেশি সড়ক অবরোধের ঘটনা ঘটেছে, যার বড় অংশই শিক্ষার্থী ও শিক্ষক সংশ্লিষ্ট আন্দোলন থেকে এসেছে।

আন্দোলনের নতুন সংস্কৃতি

আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটি ধারণা গড়ে উঠেছে—দাবি আদায়ের সবচেয়ে কার্যকর উপায় রাজপথ। ফলে পরীক্ষা বাতিল, কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর, ভাতা বৃদ্ধি কিংবা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে বারবার অবরোধে নামছেন তারা। সরকারের পক্ষ থেকেও অনেক ক্ষেত্রে দ্রুত সিদ্ধান্ত দিয়ে আন্দোলন প্রশমিত করা হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে আরও কঠোর আন্দোলনের পথ খুলে দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

শিক্ষাঙ্গনে অস্থিরতা ও নিরাপত্তাহীনতা

শুধু সড়ক অবরোধই নয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভেতরেও অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। কোথাও শিক্ষকদের পদত্যাগে বাধ্য করা হচ্ছে, কোথাও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হওয়ার ঘটনাও ঘটছে। ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু শিক্ষকরা বিশেষভাবে ঝুঁকির মধ্যে পড়েছেন বলে বিভিন্ন সংগঠন অভিযোগ তুলেছে। এতে করে অনেক শিক্ষক ক্লাস নিতে ভয় পাচ্ছেন, স্বাভাবিক পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে।

বই নেই, পরিকল্পনাও নেই

শিক্ষাব্যবস্থার আরেকটি বড় সংকট হলো পাঠ্যবই সরবরাহ। জানুয়ারির অর্ধেক পেরিয়ে গেলেও কোটি কোটি বই শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছেনি। অন্যদিকে রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য নানা কমিশন গঠিত হলেও শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক সংস্কারের জন্য এখনো কোনো সুদূরপ্রসারী রোডম্যাপ দেখা যায়নি।

বিশ্বের অভিজ্ঞতা কী বলে?

ইতিহাস বলে, যেসব দেশ বিপ্লব বা রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে, তারাই টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করেছে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত কিংবা রাশিয়ার উদাহরণ দেখায়—শিক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগই একটি জাতিকে বিশ্ব নেতৃত্বের কাতারে পৌঁছে দেয়। অথচ বাংলাদেশে স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও শিক্ষা নিয়ে আমরা এখনো সংকট ব্যবস্থাপনায় ব্যস্ত, কাঙ্ক্ষিত মানোন্নয়নের সুস্পষ্ট দিশা নেই।

ভবিষ্যৎ কোন পথে?

শিক্ষার্থীদের রাজপথে থাকার প্রবণতা, শিক্ষকদের নিরাপত্তাহীনতা, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং নীতিগত দিকনির্দেশনার অভাব—সব মিলিয়ে শিক্ষাব্যবস্থা আজ গভীর সংকটে। সামনে জাতীয় নির্বাচন। রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে যদি শিক্ষা সংস্কার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার না পায়, তাহলে এই সংকট আরও ঘনীভূত হবে।

শিক্ষা শুধু একটি খাত নয়, এটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের মূল ভিত্তি। এই ভিত্তি যদি নড়বড়ে হয়ে যায়, তাহলে নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নও টেকসই হবে না। এখনই প্রয়োজন জাতীয় ঐকমত্য, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা—যাতে শিক্ষাব্যবস্থাকে আইসিইউ থেকে বের করে সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনা যায়।

পাঠকের মতামত:

সর্বোচ্চ পঠিত