ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬, ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

পিরিয়ডের পর যখন ডাকবো চলে আসিস! বাংলাদেশের নারী ক্রিকেটারকে বিশ্বকাপে যৌ‘ন নির্যা‘তন

২০২৫ নভেম্বর ০৬ ১৯:০৮:৩৪

পিরিয়ডের পর যখন ডাকবো চলে আসিস! বাংলাদেশের নারী ক্রিকেটারকে বিশ্বকাপে যৌ‘ন নির্যা‘তন

বাংলাদেশের নারী ক্রিকেটে যৌন হয়রানির মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। জাতীয় দলের তারকা ক্রিকেটার জাহানারা আলম সম্প্রতি একটি সাক্ষাৎকারে তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া একাধিক অপ্রীতিকর ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন। তার এই বিস্ফোরক স্বীকারোক্তি দেশের ক্রীড়াঙ্গনে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।

সাক্ষাৎকারে জাহানারা আলম অত্যন্ত আবেগপ্রাপ্লুত হয়ে জানান যে, তিনি একাধিকবার যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। এই ঘটনাগুলো তাকে এতটাই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করেছে যে, তিনি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কখনো ক্ষমা করবেন না।

ঘটনার বিবরণ:জাহানারা আলমের ভাষ্যমতে, ২০২১ সাল থেকে এই ধরনের ঘটনাগুলো তাকে সবচেয়ে বেশি বিরক্ত করেছে। তার অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২১ সালে কো-অর্ডিনেটর সারফরাজ বাবুকে দিয়ে তৌহিদ ভাই তাকে অনৈতিক প্রস্তাব দেন। জাহানারা জানান, তিনি কৌশলে সেই প্রস্তাব এড়িয়ে যান। এই ঘটনার পর থেকেই মনজুরুল ইসলাম মনজু নামে এক ব্যক্তি তার সঙ্গে দুর্ব্যবহার শুরু করেন।

২০২২ সালের বিশ্বকাপের সময় মনজু ভাই তাকে আবারও অপ্রীতিকরভাবে অ্যাপ্রোচ করেন। জাহানারা জানান, নেট অনুশীলনের সময় অথবা হ্যান্ডশেক করার সময় মনজু ভাই তার কাঁধে হাত রাখতেন, তাকে নিজের বুকের কাছে টেনে নিতেন এবং কানের কাছে মুখ এনে জিজ্ঞেস করতেন, "তোর পিরিয়ডের আজ কয়দিন চলতেছে?" একবার তিনি উত্তর দেন "পাঁচ দিন", তখন মনজু ভাই বলেন, "এতদিন পিরিয়ড থাকে নাকি? মানুষের তো তিন-চার দিনে ঠিক হয়ে যাওয়ার কথা। আমার দিকটাও তো দেখতে হবে তোর। পিরিয়ড শেষ হলে আমার কাছে চলে আসিস।" এমন পরিস্থিতিতে তার পা চলতো না, তিনি জানতেন না এই লোকটিকে কী উত্তর দেবেন।

জাহানারা উল্লেখ করেন যে, প্রতিটি আন্তর্জাতিক নারী ক্রিকেট দল খেলোয়াড়দের মাসিক চক্রের তথ্য সংরক্ষণের জন্য একটি অ্যাপ ব্যবহার করে, যা ফিজিওথেরাপিস্ট বা ডাক্তাররা সংগ্রহ করেন। কিন্তু মনজু ভাই তার ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করে তাকে হয়রানি করতেন। তিনি আরও বলেন যে, মনজু ভাইয়ের অভ্যাস ছিল যেকোনো মেয়ে খেলোয়াড়কে কাঁধে ধরে নিজের বুকের কাছে টেনে নিয়ে চাপা চাপি করা। অনেক সময় মেয়েরা তাকে এড়ানোর জন্য দূর থেকে হাত বাড়িয়ে দিত। এই ঘটনাগুলো দলের মধ্যে হাসিঠাট্টারও খোরাক হতো, যেখানে বলা হতো, "ওই যে আসতেছে, এখন বুকের মধ্যে নিয়ে নিবে।"

প্রতিকার ও ন্যায়বিচার কামনা:জাহানারা আলম জানান, এই ধরনের হয়রানির কারণে তিনি দলে থাকা অবস্থায় অনেক কিছু বলতে বা প্রতিবাদ করতে পারেননি, কারণ ক্রিকেট তার রুটি-রুজির একমাত্র পথ ছিল। তবে তিনি পরে একটি "অবজারভেশন লেটার" (অভিযোগপত্র নয়) সরাসরি বিসিবির সিইওর কাছে জমা দেন। সেখানে তিনি তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া প্রতিটি ছোট-বড় ঘটনা, সময়, তারিখ এবং ব্যবহৃত আপত্তিকর শব্দ উল্লেখ করেন।

তিনি আরও জানান, একটি প্রথম বিভাগের মহিলা ক্রিকেটারও একই ধরনের হয়রানির শিকার হলে তার সাহায্য চায়। সেই মেয়েটির দেওয়া ভয়েস রেকর্ডও তিনি সিইওর কাছে প্রমাণ হিসেবে জমা দেন। জাহানারা আলম দৃঢ়ভাবে জানান যে, তিনি এসব মানুষের বিচার চান এবং বিসিবির কাছে নয়, আল্লাহর কাছে এদের বিচার চেয়েছেন। তিনি চান তার চোখের সামনেই যেন এদের বিচার হয়।

১৬ বছর ধরে জাতীয় দলে সেবা দেওয়া এবং আড়াই বছর জাতীয় দলের নেতৃত্ব দেওয়ার পরও এমন মানসিক চাপের কারণে জাতীয় দল থেকে বিরতি নিতে বাধ্য হয়েছেন বলে তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করেন। তিনি এও বলেন যে, তার মতো একজন মানুষের কেন মানসিক চাপের কারণে এমন সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তিনি ক্রিকেট খেলে যা আয় করতেন এবং বিভিন্ন বিজ্ঞাপনী চুক্তি থেকে যা পেতেন, তা দিয়েই চলতেন, তাই জাতীয় দলের বেতন না পেলেও তার অসুবিধা ছিল না। তার বিবেক তাকে খেলতে না পারার জন্য বেতন নিতে সায় দেয়নি।

তার মূল দাবি, নারী ক্রিকেটারদের জন্য যেন একটি নিরাপদ ও সুরক্ষিত পরিবেশ নিশ্চিত করা হয়, যাতে ভবিষ্যতে কোনো মেয়ে এমন হয়রানির শিকার না হয়।

ভিডিওটি দেখতে এখানেক্লিক করুন

পাঠকের মতামত:

সর্বোচ্চ পঠিত