| ঢাকা, রবিবার, ২৪ জানুয়ারি ২০২১, ১০ মাঘ ১৪২৭

মরুর বুকে বাংলাদেশের আলো রেফারি শেখ আলী

২০২০ ডিসেম্বর ০২ ০০:১৯:০২
মরুর বুকে বাংলাদেশের আলো রেফারি শেখ আলী

রক্তে তার খেলাধুলা। ক্রীড়ার প্রতি এই ভালোবাসাই পাল্টে দিয়েছে শিয়াকত আলীর জীবন। সাধারণ একজন শ্রমিকের বদলে তিনি এখন মাঠের সম্মানিত ব্যক্তি। দাবিয়ে বেড়াচ্ছেন কাতারের ফুটবল মাঠসহ অন্য আরব দেশ। কাতার ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনে অবশ্য শিয়াকতকে সবাই চেনে বাঙালি কুরা হাকাম মোহাম্মদ শেখ আলী নামে। কুরা অর্থ ফুটবল, হাকাম অর্থ রেফারি। এই পরিচয়েই তিনি পরিচালনা করেছেন দুই হাজারের মতো ম্যাচ। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক ম্যাচ ১৫০টি। স্কুল পর্যায়ে অ্যাথলেট এবং ভালো সাঁতারু ছিলেন তিনি। এরপর ২০১৩ সালে জীবিকার সন্ধানে কাতারে আসেন।

এক আত্মীয়ের মাধ্যমে শ্রমিক ভিসায় আসা। আসার পর অবশ্য বসেই ছিলেন কয়েক মাস। এরপর স্প্যানিশ ক্লাব বার্সেলোনার একটি ফুটবল প্রজেক্ট শুরু হয় কাতারে। ওই প্রজেক্টের জন্য স্কুলে স্কুলে গিয়ে খেলোয়াড় সংগ্রহের কাজ করতে তিনি আগ্রহ প্রকাশ করেন কাতারস্থ বার্সেলোনা প্রজেক্টের সিইও’র কাছে।তিনি ওই সময় জানান, ‘আমি বাংলাদেশে স্কুলে ক্রীড়া শিক্ষক ছিলাম। রেফারিং করেছি। আমার কথা শুনে ওই সিইও সম্মতি দেন কাজের সুযোগের।’

তখন খেলোয়াড় সংগ্রহের পাশাপাশি খেলাও পরিচালনা করেন কয়েক ম্যাচে। এতেই জীবনের রং বদলানো শুরু চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার এই ছেলের। প্রজেক্ট শেষে তিনি কাজের সুযোগের জন্য আবেদন করেন কাতার ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনে। সবুজ সংকেত মিলে সেখান থেকে। এরপর শিয়াকতের যেমন পরিবর্তন নামের, তেমনি জীবনেরও। তিনি বলেন, ‘ফুটবল রেফারি হয়ে বেশ ভালোই অর্থ পাচ্ছি আমি। প্রতি মাসে প্রায় আড়াই হাজার ডলার পাই খেলা চালিয়ে।’

কাতার এশিয়ার ফুটবল উন্নত একটি দেশ। বর্তমান এশিয়া চ্যাম্পিয়ন। ২০২২ বিশ্বকাপের স্বাগতিক দেশ। তেলসমৃদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম ধনী এই দেশে রেফারিদেরও পারিশ্রমিক ভালো।শিয়াকত জানান, ‘এ দেশে রেফারিদের ম্যাচ প্রতি সর্বনিম্ন পারিশ্রমিক ২০০ ডলার। আর সর্বোচ্চ এক হাজার ডলার। রেফারি উন্নয়নে কাতারের বাজেট ৭০০ কোটি টাকা। তাদের ফিফা ও পেশাদারী রেফারি ১২০ জন। ভার (ভিডিও অ্যাসিসটেন্ট রেফারি) প্রজেক্টের জন্য কাতারের বাজেট ২০০ কোটি টাকার মতো।’

শিয়াকত এখন কাতারের ন্যাশনাল রেফারি। এখন অপেক্ষায় ফিফা ব্যাজধারী রেফারি হওয়ার। তার আগে সিরিয়ালে সিনিয়র হিসেবে আছেন ১৫ থেকে ১৬ জন। এদের পরেই সুযোগ আসবে শিয়াকতের।শিয়াকতের দেয়া তথ্য, ‘কাতার ফুটবলে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে তিনিই একমাত্র বাংলাদেশী রেফারি। কাতারে বসেই বাংলাদেশ দলের দুটি খেলায় সহকারী রেফারির ভূমিকা পালন করেছেন। এবার বাংলাদেশ যে দুটি প্রস্তুতি ম্যাচ খেলেছে উভয় ম্যাচেই তিনি ছিলেন পতাকা হাতে। ২০১৭ সালে কাতারে অনুষ্ঠিত এএফসি অনূর্ধ্ব-১৬ ফুটবলে কাতার-বাংলাদেশের ম্যাচে রেফারির প্যানেলে ছিলেন। পরে অবশ্য তাকে আর দায়িত্ব দেয়া হয়নি। খেলা পরিচালনার জন্য তিনি জর্ডান, কুয়েত, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান ও বাহরাইন সফর করেছেন।

তুর্কমেনিস্তান-কাতার, লেবানন-পাকিস্তান সিনিয়র জাতীয় দলের ফিফা প্রীতি ম্যাচ ছাড়াও বয়সভিত্তিক বিভিন্ন দেশের ম্যাচের খেলা পরিচালনা করেন। ক্লাবের বয়সভিত্তিক দলের মধ্যে ছিল এসি মিলান, রিয়াল ও অ্যাথলেটিকো মাদ্রিদ, বায়ার্ন মিউনিখ, বোকা জুনিয়র্স, এফসি ফ্রাঙ্কফুটের খেলা পরিচালনা করেছেন আলকাস আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে।

কাতারে সারাবছর মিলে ছোট বড় মিলে ৪২টি লিগ চলে। যে কারণে রেফারিদের চাহিদাও বেশি। শিয়াকত বলেন, ২০১৭ সালে আমি এক দিনে সাতটি ম্যাচে প্রতিনিধিত্ব করেছি। এই ম্যাচগুলো ছিল এক ঘণ্টার। ২০১৮ সালে এক দিনে চারটি ম্যাচ পরিচালনা করেছি। সব ম্যাচই ছিল ৯০ মিনিটের। আসলে সেদিন সব ম্যাচের তারিখ একই দিনে পড়ে যায়।’

কাতার লিগ ও টুর্নামেন্ট মিলে এ পর্যন্ত ২০টি ফাইনাল ম্যাচে সহকারী রেফারি ছিলেন শিয়াকত। এখন তার ইচ্ছে দুই বছর পর ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে রেফারিং করার। কাতার ফুটবল অ্যাসোসিয়শনের নিয়ম হলো, কোনো রেফারির ১০ বছরের অভিজ্ঞতা হলে তাদের বিশেষ সার্টিফিকেটের মাধ্যমে ইংলিশ লিগে রেফারিং করার সুযোগ দেয়া হয়।

শিয়াকত এখন ইচ্ছে করলে বাংলাদেশের রেফারি হিসেবেই ফিফা রেফারি হতে পারেন। চেষ্টা করতে পারেন এএফসির এলিট রেফারি প্যানেলে অন্তর্ভুক্ত হতে। বিষয়টি অবশ্য তিনি ছেড়ে দিয়েছেন বাফুফের রেফারিজ বোর্ডের উরপই।

‘বাংলাদেশ যদি আমাকে চায় ফিফা রেফারি করতে তাহলে দেশের প্রয়োজনে আমি সম্মত আছি’, বলেন শিয়াকত।তিনি বলেন, ‘রেফারিদের নিরাপত্তা বেশ ভালো কাতারে। নির্দিষ্ট ওজনের চেয়ে এক কেজি বেশি হলেই তার ম্যাচ বাদ। পাঠানো হয় উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য বিশেষ ট্রেনিংয়ে।’

‘আমার জানা মতে, কাতারই বিশ্বের একমাত্র দেশ যেখানে ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন থেকে ক্রীড়া বিজ্ঞানে উচ্চতর ডিগ্রী প্রদান করা হয়। নিয়মিত ফিটনেস ট্রেনিং হয় রেফারিদের। তা সপ্তাহে ছয় দিন। প্রতি সপ্তাহে মঙ্গলবার ও বুধবার খেলার আইন-কানুনের ক্লাস হয়’, তথ্য দেন শিয়াকত।সাবেক রেফারি মরহুম মনিরুল ইসলামের অনুরোধে ২০১৬ সালে বাংলাদেশে গিয়ে দুটি ম্যাচও পরিচালনা করেছিলেন শিয়াকত।

পাঠকের মতামত:

ফুটবল এর সর্বশেষ খবর

ফুটবল - এর সব খবর



রে