| ঢাকা, শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২০, ১৫ কার্তিক ১৪২৭

নতুন পদ্ধতিতে মাছ চাষে আকবরের দারুন সাফল্য

২০২০ অক্টোবর ১৭ ১৬:২৯:১৬
নতুন পদ্ধতিতে মাছ চাষে আকবরের দারুন সাফল্য

অত্যাধুনিক ও সম্পূর্ণ নতুন প্রযুক্তিতে মাছ চাষে ব্যতিক্রমী বিপ্লব ঘটিয়েছেন আকবর হোসেন। নতুন এ প্রযুক্তির সাহায্যে স্বল্প জায়গায় অধিক পরিমাণে মাছ চাষ করছেন তিনি।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের বরেন্দ্র ভূমির বুলনপুরে বিশেষ এই খামার গড়ে সেখানেই মাছ চাষে অভিনব এই বিপ্লব ঘটিয়েছেন আকবর। মৎস্য চাষে বিপ্লব ঘটানো নব উদ্ভাবিত এই প্রযুক্তির নাম ‘ইন পন্ড রেসওয়ে সিস্টেম’ বা আইপিআরএস।

আকবর হোসেনের দাবি আইপিআরএস প্রযুক্তির মাছের খামার দেশে তারটাই প্রথম। দক্ষিণ এশিয়ায় একই প্রযুক্তিতে ভারতে দুটি ও পাকিস্তানে মোট তিনটি খামার রয়েছে। আমেরিকান এই প্রযুক্তিটি আমদানি করে চীন গত কয়েক বছরে মাছ চাষে অভূতপুর্ব বিপ্লব ঘটিয়েছে। এই প্রযুক্তির বিশেষত্ব হলো– স্বল্প জলাশয়ে মানসম্মত অধিক পরিমাণে মাছ উৎপন্ন করা।

‘নবাব হাইটেক মৎস্য খামার’ সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, ৬০ বিঘার পুকুরে তৈরি করা হয়েছে কংক্রিটের ১৩টি চ্যানেল বা পানির প্রবাহ।পাইপ লাইনে সংযুক্ত রেসওয়ে প্রযুক্তির মাধ্যমে চ্যানেলগুলোতে কৃত্রিমভাবে স্রোত তৈরি করা হয়েছে।

ফলে প্রবহমান পানিতে ২৪ ঘণ্টার অধিক অক্সিজেন তৈরি হচ্ছে। জলাশয়ের মাছেরা প্রতিটি চ্যানেলে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে উন্নত ও পুষ্টিকর খাবার পাচ্ছে। পাশাপাশি মাছেরা অবাধ বিচরণ করছে।

একেকটি চ্যানেলে রয়েছে একেক প্রজাতির মাছ। কৃত্রিম স্রোত প্রবাহের কারণে অধিক অক্সিজেন তৈরি হওয়ায় স্বল্প জায়গাতে স্বাভাবিকের ছয়গুণ বেশি মাছ বসবাস করতে পারছে।

প্রযুক্তির সাহায্যে খাবার সরবরাহ ও সুষ্ঠুভাবে পরিচর্যা হওয়ায় মাছ দ্রুত বেড়ে ওঠছে। এই প্রযুক্তির গুণে মাছে কোনো রোগ বালাইও সংক্রমিত হতে পারে না।

উদ্যোক্তা আকবর হোসেন জানান, গত বছর ব্যবসার কাজে চীনে গিয়ে আইপিআরএস প্রযুক্তি দেখে তিনি উদ্বুদ্ধ হন। এরপর দেশে ফিরে এই প্রযুক্তিতে মৎস্য খামার গড়ে তোলেন।

তিনি বলেন, চলতি বছরের প্রথমদিকে চীন থেকে আইপিআরএস প্রযুক্তি আমদানি করেন। চীনা প্রযুক্তিবিদ ও প্রকৌশলীরা তার ৬০ বিঘা জলাশয়ে সমস্ত যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম স্থাপন করে দিয়ে যান।

এই নতুন প্রযুক্তির খামারে গড়ে ৫ কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করেন।

আকবর হোসেন আরও জানান, ৬০০ বিঘা জলাশয়ে যে পরিমাণ মাছ পাওয়া সম্ভব, আইপিআরএস প্রযুক্তির ৬০ বিঘার খামারে সেই মাছ উৎপাদন করা সম্ভব। আর মাত্র দুই মাস পর তিনি মাছ হারভেস্ট করবেন।

তিনি আশা করছেন এক বছরে দুই মৌসুমে তিনি ৬০ বিঘা জলাশয় থেকে দুই হাজার টন মাছ পাবেন। এই পরিমাণ মাছের বাজার মূল্য ১০ কোটি টাকা।

তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন এলাকায় ফসলি জমি কেটে পুকুর বানিয়ে মাছ চাষের একটা প্রবণতা চলছে। এতে কৃষি পণ্য বা ফসল উৎপাদনের জমি কমে যাচ্ছে।

‘এতে খাদ্য উৎপাদনের ওপর নেতিবাচক প্রভাবও পড়ছে। কিন্তু দেশে যদি আইপিআরএস প্রযুক্তিতে খামার গড়ে তোলা হয়; তাহলে কম জায়গাতেই বেশি মাছ পাওয়া যাবে। এতে ফসলি জমি নষ্ট করে হাজার হাজার পুকুর তৈরির দরকার পড়বে না।’

একদিকে যেমন ফসলি জমি বাঁচবে, অন্যদিকে কম জায়গায় বেশি মাছ পাওয়া যাবে। আবার দেশে মাছের চাহিদা পূরণে বড় ভূমিকা রাখবে। এই সাশ্রয়ী প্রযুক্তির প্রয়োগ করে তিনি আরও খামার করতে চান বলে জানিয়েছেন।

জানা গেছে, কয়েক বছর ধরেই আকবর হোসেন মাছ চাষ করছেন। বরেন্দ্র ভূমিতে তার আরও ৪২টি পুকুর রয়েছে। সেগুলোতে তিনি দেশীয় পদ্ধতিতে মাছ চাষ করেন। মাছ চাষে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখার জন্য তিনি ২০১৭ সালে দেশের শ্রেষ্ঠ মৎস্য-চাষির পুরস্কার লাভ করেন।

আকবর জানান, দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে প্রতিদিনই মৎস্যচাষিরা তার খামার পরিদর্শনে আসেন। মৎস্য বিজ্ঞানীরাও আসছেন। পরামর্শ দিচ্ছেন ও খামারের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন।

তিনি আরও জানান, আইপিআরএস প্রযুক্তিতে উৎপাদিত মাছের স্বাদ নদীর মাছের মতোই। তিনি তা পরীক্ষা করে দেখেছেন। এই খামারের সাফল্যের ধারাবাহিকতায় তিনি একই প্রযুক্তিতে আরও খামার গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়েছেন।

আকবর হোসেন বলেন, দেশে মাছের চাহিদা পূরণে হাজার হাজার পুকুর খননের প্রয়োজন নেই। আইপিআরএস প্রযুক্তিতে কয়েক হাজার খামার প্রতিষ্ঠা করলেই বছরে বিপুল পরিমাণ মাছ উৎপাদিত হবে। দেশের চাহিদা মিটিয়ে এই মাছ আমরা বিদেশেও পাঠাতে পারব।

পাঠকের মতামত:

জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর



রে