| ঢাকা, রবিবার, ১৭ নভেম্বর ২০১৯, ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

লি’ঙ্গমুন্ডুতে প্রদাহ ও লিঙ্গের ক্যান্সার এর কারণ, লক্ষণ ও চিকিৎসা…

২০১৮ আগস্ট ১৮ ২৩:০৯:১০
লি’ঙ্গমুন্ডুতে প্রদাহ ও লিঙ্গের ক্যান্সার এর কারণ, লক্ষণ ও চিকিৎসা…

বর্তমান যুগে অ‌নেক পুরুষের মধ্যেই একটা সমস্যা বেশ প্রকট হয়ে উঠছে, তা হ‌লো লি’ঙ্গ প্রদাহ বা ব্যালানাই‌টিস, বাংলায় যাকে মনোষ বলা হয়ে থাকে। ব্যালানাইটিস শব্দটি গ্রিক ব্যালানস থেকে এসেছে। ব্যালানস শব্দের অর্থ লিঙ্গ মুন্ডু বা লিঙ্গের মাথা। লি’ঙ্গাগ্রের চামড়া আক্রান্ত হলে তাকে বলে ব্যালানোপসথাইটিস। লিঙ্গমুন্ডুর চারপাশে এক ধরনের ময়লা জমা ও নিঃসরণের কারণে জায়গাটা বাতাসের সংস্পর্শ কম পায় এবং সেখানে চুলকানি ও জ্বালাপোড়া হয়; এ কারণে লি’ঙ্গমুন্ডুতে প্রদাহ হয় ও লি’ঙ্গমুন্ডু ফুলে যায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা গেছে, যাদের খতনা করা হয়নি, তারাই এ সমস্যায় বেশি ভোগেন।

রোগের কারণ:

সাবান, শাওয়ার জেল বা কনডমের উপরিভাগের আঠালো পদার্থ পুরুষাঙ্গের মুখে জ্বালাপোড়া সৃষ্টি করে যা থেকে ব্যালানাইটিস হয়ে থাকে।নির্দিষ্ট কিছু ঔষধ যেমন- পেইনকিলার, ঘুমের ঔষধ, ল্যাক্সেটিভ (কোষ্ঠকাঠিন্যে ব্যবহৃত ঔষধ) ও অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের কারণে এই সমস্যা হয়ে থাকে। এগুলোকে ফিক্সড ড্রাগ ইরাপশনও বলে।

সাধারণত নির্দিষ্ট কিছু ব্যাকটেরিয়া ও ঈস্ট যেমন- ক্যান্ডিডা অ্যালবিকান্স পুরুষাঙ্গের উপরিভাগেই থাকে। তাপ, চাপ, সাবান দিয়ে ওই স্থান পরিষ্কার করলে বা একেবারেই পরিষ্কার না করলে এসিড লেভেল ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ে, যার কারণে এই রোগ হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

পুরুষাঙ্গের অগ্রভাগে কোনভাবে কেটে গেলে বা আঁচড় লাগলে এই রোগ হতে পারে।ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীদের ইনফেকশনে হওয়ার ঝুঁকি বেশি। ইনফেকশন থেকেই ব্যালানাইটিস হতে পারে।চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, খতনা করা হয়নি এমন ছেলেদের মধ্যে এ রোগের প্রকোশ বেশি। খতনা করা হয়নি এমন যে কোনো বয়সী পুরুষের যে কোনো সময় লিঙ্গমুন্ডুতে প্রদাহ হতে পারে। যেসব পুরুষের লিঙ্গাগ্রের চামড়া টাইট বা আঁটোসাঁটো থাকে অর্থাৎ চামড়া পেছনের দিকে টেনে নামানো কষ্টকর অথবা যেসব পুরুষ লিঙ্গ ঠিক মতো পরিষ্কার করেন না তারা ব্যালানাইটিস বা লিঙ্গমুন্ডুতে প্রদাহ রোগে আক্রান্ত হন। তবে খতনা করানো হয়েছে এমন ছেলেও এ রোগে আক্রান্ত হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে ডায়াবেটিসের কারণেও লিঙ্গমুন্ডুতে প্রদাহ হয়, বিশেষ করে যদি রক্তে চিনির পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ না থাকে।

লিঙ্গের পরিচ্ছন্নতা: অনেকেই লিঙ্গের পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে উদাসীন থাকেন। বিশেষ করে ছোট ছেলেরা এ ব্যাপারে সচেতন নয়। বহু গবেষণায় দেখা গেছে, লিঙ্গমুন্ডুতে প্রদাহের সাথে লিঙ্গের পরিচ্ছন্নতার সম্পর্ক রয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব পুরুষ সম্পূর্ণ লিঙ্গ ধৌত করেন না এবং যেসব পুরুষ খতনা করাননি তারা সচরাচর ব্যালানাইটিসে আক্রান্ত হন। আবার সাবান দিয়ে লিঙ্গ অতিরিক্ত পরিষ্কার করলেও ব্যালানাইটিস হয়।

লক্ষণ: এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে চিকিৎসকেরা নিম্নলিখিত লক্ষণগুলি চিহ্নিত করে থাকেন।

পেনিস বা পুরুষাঙ্গে লালভাব দেখা দেওয়া (Penis redness)পুরুষাঙ্গে ব্যথা হওয়া (Penis pain)ডায়পার র‍্যাশ (Diapper Rash)ত্বকের ফুসকুড়ি (Skin rash)অস্বাভাবিক ত্বক (Abnormal appearing skin)জ্বর (Fever)

মূত্রত্যাগের সময় ব্যথা হওয়া (Painful urination)কাশি (Cough)তলপেটের নিচের দিকে ব্যথা হওয়া (Suprapubic pain)পেনিস বা পুরুষাঙ্গ দিয়ে তরল নির্গত হওয়া (Penile discharge)ত্বকের ক্ষত (Skin lesion)ত্বকে চুলকানি (Itching of skin)

রোগ নির্ণয়: রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে সতর্কতার সাথে রোগীর সম্পূর্ণ ইতিহাস জানতে হবে। লিঙ্গমুন্ডু থেকে রস নিঃসরণ হলে তার কালচার পরীক্ষা করাতে হবে এবং ক্ষেত্র বিশেষে বায়োপসি করাতে হবে।জটিলতা: ব্যালানাইটিসের কারণে লিঙ্গমুন্ডু ফুলে যেতে পারে। এর ফলে যাদের খতনা করা হয়নি তাদের লিঙ্গাগ্রের ত্বক টেনে নিচে নামানো অসাধ্য হয়ে পড়ে। জায়গাটিতে মারাত্মক ইনফেকশন দেখা দেয়। লিঙ্গমুন্ডুর ত্বক লাল হয়ে যায় ও ফুলে যায়।

লিঙ্গের ক্যান্সার: পুরুষাঙ্গের যেকোনো স্থানে ক্যান্সার হতে পারে। তবে সবচেয়ে বেশি হয় পুরুষাঙ্গের অগ্রভাগের চামড়া অথবা মাথায় (লিঙ্গমুণ্ডুতে)। সাধারণত এই ক্যান্সার ধীরে ধীরে বিস্তার লাভ করে। প্রাথমিক অবস্থায় রোগ ধরা পড়লে চিকিৎসায় সেরে যায়। আমেরিকায় লিঙ্গ বা পুরুষাঙ্গের ক্যান্সার খুব বিরল। প্রতি ১ লাখ পুরুষের মধ্যে মাত্র একজন বা দু’জন। যেসব ছেলেশিশুর খতনা করা হয়েছে তাদের মধ্যে লিঙ্গের ক্যান্সার নেই বললেই চলে। বাংলাদেশে অনেক পুরুষের লিঙ্গের ক্যান্সার দেখা দেয়, বিশেষ করে যেসব পুরুষের খতনা করানো হয় না। দুঃখজনক ব্যাপার হলো কিছু পুরুষ ক্যান্সার ছড়িয়ে যাওয়া না পর্যন্ত চিকিৎসকের দ্বারস্থ হন না।

প্রায় সব লিঙ্গের ক্যান্সার হলো ত্বকের ক্যান্সার। এর সবচেয়ে সাধারণ ধরনটি হলো স্কোয়ামাস সেল কার্সিনোমা, যার সাথে ত্বকের অন্য অংশের যেমন মুখ বা হাতের স্কোয়ামাস সেল কার্সিনোমার মিল রয়েছে। কিছু লিঙ্গের ক্যান্সার হলো মেলানোমো, যেগুলো নীল-বাদামি চ্যাপ্টা গ্রোথ হিসেবে আবির্ভূত হয় এবং যার প্রবণতা থাকে দ্রুত ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার। মাঝে মাঝে লিঙ্গের গভীর টিস্যুতে ক্যান্সার হয়। এটার নাম সারকোমা। ত্বকের যে জায়গায় প্রথম ক্যান্সার দেখা দেয়, সে জায়গায় ক্যান্সার ধীরে ধীরে বড় আকারে ছড়াতে থাকে। শেষ পর্যন্ত এটা লিঙ্গের শরীরের ভেতরে গভীর টিস্যুতে ছড়িয়ে পড়ে এবং কুঁচকির লিম্ফনোডগুলোতে বা তলপেটে ছড়িয়ে যায়।

যদি ক্যান্সার শুধু লিঙ্গে সীমাবদ্ধ থাকে এবং আশপাশে কুঁচকি এলাকার লিম্ফনোডে ছড়িয়ে না পড়ে, তাহলে চিকিৎসার মাধ্যমে তা সারানো যেতে পারে। কিন্তু ক্যান্সার যদি একবার তলপেটের লিম্ফনোডে ছড়িয়ে পড়ে তাহলে তা আর সারানো সম্ভব হয় না। একবার লিঙ্গের ক্যান্সার ধরা পড়লে, তা লিঙ্গ থেকে শরীরের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়েছে কি না তা নিরূপণ করার জন্য বেশ কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হবে।

ক্যান্সার ছড়ানোর বিভিন্ন স্তর রয়েছে: স্তর ১: ক্যান্সার কোষ কেবল লিঙ্গের মাথায় ও মাথার চামড়ায় দেখা যায়। স্তর ২: ক্যান্সার কোষ লিঙ্গের মাথার গভীর টিসুতে দেখা যায় এবং কোষগুলো লিঙ্গের শরীরে ছড়িয়ে যায়। স্তর ৩:ক্যান্সার কোষগুলো লিঙ্গে দেখা যায় এবং কেষাগুলো কুঁচকি এলাকার লিম্ফনোডগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। স্তর ৪: ক্যান্সার কোষগুলো সমস্ত লিঙ্গে এবং কুঁচকির লিম্ফনোডগুলোতে দেখা যায় এবং শরীরের অন্য অঙ্গগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে।

লিঙ্গের ক্যান্সারের কারণ ও ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়গুলো: যেসব পুরুষের জন্মের সময় খতনা করা হয়, তাদের অধিকাংশেরই পরে কখনো লিঙ্গের ক্যান্সার হয় না। বয়ঃসকিালে খতনা করালে পরে ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা কিছুটা বেশি থাকে, আর যেসব পুরুষ প্রাপ্ত বয়স্ককালে খতনা করান, তাদের লিঙ্গে ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি যারা কখনোই খতনা করাননি, তাদের চেয়ে মোটেই কম নয়। সাধারণ অর্থে লিঙ্গের ক্যান্সার হলো­ অপরিচ্ছন্নতার অসুখ। এটা বিশ্বাস করা হয় যে, লিঙ্গের মাথার চামড়ার নিচে জমে থাকা কোষগুলো (স্মেগমা) চুলকানি বা জ্বালাপোড়া সৃষ্টি করে এবং ক্যান্সার ঘটায়।

যেসব পুরুষের যৌনাঙ্গে ভাইরাসজনিত আঁচিল হয় তাদের লিঙ্গে ক্যান্সার হওয়ার অনেক ঝুঁকি থাকে। ভাইরাসজনিত আঁচিল (কনডাইলোমা অ্যাকুমিনাটা) এবং লিঙ্গের ক্যান্সারের মধ্যে একটা সম্পর্ক রয়েছে। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে কিছু নির্দিষ্ট ধরনের ভাইরাস (হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস-টাইপ ১৬ ও ১৮) কনডাইলোমাটা এবং লিঙ্গের ক্যান্সার ঘটায়। এসব হিউমান প্যাপিলোমা ভাইরাস (এইচপিভি) মহিলাদের ভেতরেও দেখা যায়­ যাদের জরায়ু মুখের ক্যান্সার রয়েছে। যে মহিলার জরায়ু মুখের ক্যান্সার রয়েছে, সেই মহিলার সাথে কোনো খতনা না করানো পুরুষ যৌনমিলন করলে সেই পুরুষের লিঙ্গে ক্যান্সার হওয়ার উচ্চ ঝুঁকি থাকে।

লিঙ্গের ক্যান্সারের উপসর্গ: ১. লিঙ্গে বিশেষ ধরনের গোটা বা ক্ষত দেখা দেয়। ২. লিঙ্গের চামড়ার রঙ পরিবর্তন হয়।রোগ নির্ণয়: অন্যান্য ক্যান্সারের মতো লিঙ্গের ক্যান্সার বায়োপসি করে নির্ণয় করা হয়।চিকিৎসা: চিকিৎসা নিরূপণ করা হয় টিউমারের আকার ও স্তর দেখে। যদি টিউমারটি ছোট এবং এক জায়গায় সীমাবদ্ধ থাকে তাহলে লিঙ্গের কাজে বিঘ্ন না ঘটিয়ে কিংবা লিঙ্গে বড় ধরনের ক্ষতি না করে অপারেশন, রাসায়নিক দ্রবণ বা রেডিয়েশন কিংবা লেজারের মাধ্যমে চিকিৎসা করা যেতে পারে। যদি ক্যান্সার লিঙ্গের টিসুর গভীরে ঢুকে যায় কিংবা টিউমারটি বড় হয় তাহরে বেশির ভাগ পুরুষের ক্ষেত্রে সার্জারিই হলো পছন্দনীয় চিকিৎসা। রেডিয়েশনও দেয়া যেতে পারে, কিন্তু তার ফল অতটা ভালো নয়। যদি টিউমার লিম্ফনোডে ছড়িয়ে যায় তাহরে সার্জারি বা রেডিয়েশন প্রয়োগ করা হয়। বিস্তৃত লিঙ্গের ক্যান্সারের ক্ষেত্রে কেমোথেরাপি তেমন একটা কাজে আসে না।

ডা. মিজানুর রহমান কল্লোল, জেনারেল ও ল্যাপারোস্কপিক সার্জনসূত্র: দেহ

পাঠকের মতামত:

লাইফস্টাইল এর সর্বশেষ খবর

লাইফস্টাইল - এর সব খবর



রে