ঢাকা, মঙ্গলবার, ৯ জুন ২০২৬, ২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

বিশ্বকাপ ম্যাচে স্মৃতি হারিয়ে ফেলা এক বিশ্বজয়ী: অবিশ্বাস্য গল্প

২০২৬ জুন ০৯ ০৭:০৪:১৩

বিশ্বকাপ ম্যাচে স্মৃতি হারিয়ে ফেলা এক বিশ্বজয়ী: অবিশ্বাস্য গল্প

ফুটবল ইতিহাসে অনেক অদ্ভুত ও নাটকীয় ঘটনা আছে, কিন্তু ২০১৪ বিশ্বকাপ ফাইনালের রাতে জার্মান মিডফিল্ডার ক্রিস্টোফ ক্রেমারের ঘটনা আজও আলাদা করে মনে রাখা হয়। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে মারাকানা স্টেডিয়ামে হওয়া সেই মহারণে মাঠেই স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলেছিলেন তিনি, অথচ শেষ পর্যন্ত হয়ে উঠেছিলেন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলের অংশ।

ম্যাচের শুরু থেকেই সাধারণের মতো খেলতে নামেননি ক্রেমার। তিনি শুরুর একাদশে থাকার কথা ছিল না। শেষ মুহূর্তে সতীর্থ সামি খেদিরা চোট পাওয়ায় হঠাৎ করেই তাকে মাঠে নামার নির্দেশ দেন কোচ ইওয়াখিম ল্যোফ। ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হিসেবে দায়িত্ব পেলেও চাপের সেই মঞ্চে শুরু থেকেই কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়েন তিনি।

ম্যাচের ১৭ মিনিটে আর্জেন্টিনার এজেকিয়েল গারাইয়ের সঙ্গে সংঘর্ষে মাথায় আঘাত পান ক্রেমার। প্রাথমিক চিকিৎসার পর তাকে মাঠে ফেরানো হলেও তার অবস্থা তখন ধীরে ধীরে খারাপ হতে থাকে। মাঠে থাকা অবস্থাতেই তিনি বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন এবং খেলার পরিস্থিতি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা হারাতে শুরু করেন।

সবচেয়ে অবাক করা মুহূর্ত আসে যখন তিনি রেফারি নিকোলা রিজ্জোলিকে জিজ্ঞেস করেন, এটি কি বিশ্বকাপ ফাইনাল। রেফারি প্রথমে বিষয়টি বুঝতে না পারলেও পরে টের পান যে খেলোয়াড়টি গুরুতর সমস্যায় আছেন। সঙ্গে সঙ্গে জার্মান ডাগআউটকে জানানো হয় এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই ক্রেমারকে মাঠ থেকে তুলে নেওয়া হয়।

মাত্র ৩১ মিনিটে তার ফাইনাল শেষ হয়ে যায়। পরে চিকিৎসকরা নিশ্চিত করেন যে মাথার আঘাতের কারণে তিনি কিছু সময়ের জন্য স্মৃতিভ্রষ্ট অবস্থায় ছিলেন। অর্থাৎ, তিনি বুঝতেই পারছিলেন না তিনি কোন ম্যাচে খেলছেন।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, সেই ম্যাচই ছিল ২০১৪ বিশ্বকাপ ফাইনাল, যেখানে অতিরিক্ত সময়ে মারিও গোটজের একমাত্র গোলে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে জার্মানি চতুর্থবারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়। আশ্চর্যের বিষয় হলো, ওই গোলে যেই আক্রমণের শুরু হয়েছিল, সেই সময় ক্রেমারের বদলি হিসেবে মাঠে নামা আন্দ্রে শুর্লেই ছিল অ্যাসিস্টের অংশ।

ম্যাচ শেষে জানা যায়, ক্রেমারের অনেক স্মৃতিই তিনি মনে করতে পারেননি। এমনকি তিনি ড্রেসিংরুমে কীভাবে গিয়েছিলেন বা ম্যাচের অনেক অংশই তার মনে ছিল না। তার কাছে মনে হয়েছিল যেন খেলা দ্বিতীয়ার্ধ থেকে শুরু হয়েছে।

ক্লাব পর্যায়ে বরুসিয়া মনশেনগ্লাডবাখের হয়ে দীর্ঘ ক্যারিয়ার কাটানো এই মিডফিল্ডার পরে জাতীয় দল থেকে ধীরে ধীরে বাইরে চলে যান। ২০১৬ সালের পর আর জাতীয় দলে সুযোগ পাননি তিনি। দীর্ঘ পেশাদার ক্যারিয়ারের একমাত্র বড় ট্রফি হিসেবে থেকে যায় সেই বিশ্বকাপ জয়।

অবসরের পর তিনি ফুটবল বিশ্লেষক ও ধারাভাষ্যকার হিসেবে কাজ শুরু করেন এবং লেখালেখিতেও যুক্ত হন। নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে বইও প্রকাশ করেন তিনি, যেখানে উঠে এসেছে সেই স্মৃতিভ্রষ্ট ফাইনালের রাতের গল্প।

ক্রিস্টোফ ক্রেমারের ঘটনা ফুটবল ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায় হয়ে আছে। যেখানে একজন খেলোয়াড় ম্যাচের গুরুত্বই বুঝতে পারেননি, অথচ সেই ম্যাচেই তিনি হয়ে যান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলের সদস্য।

পাঠকের মতামত:

সর্বোচ্চ পঠিত

ফুটবল এর অন্যান্য সংবাদ